জাতীয়

মার্কিন রাজনীতিতে বামপন্থী ধারার উত্থান: ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে নতুন চ্যালেঞ্জ

মার্কিন রাজনীতিতে বামপন্থী ধারার উত্থান: ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে নতুন চ্যালেঞ্জ
মার্কিন রাজনীতিতে বামপন্থী ধারার উত্থান: ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে নতুন চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থী বা প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার উত্থান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে ডিএসএ প্রার্থীরা বাছাইপর্বে সাফল্য পেলেও সাধারণ নির্বাচনে তাদের 'ইলেকটেবিলিটি' নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সম্প্রতি বামপন্থী বা প্রগতিশীল ধারার উত্থান দেখা যাচ্ছে, যা ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে দক্ষিণপন্থী সরকার গঠনের বিপরীত চিত্র। গত বছর নিউইয়র্কে জোহরান মামদানির বিজয়ের পর থেকে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রগতিশীলদের মধ্যে একটি নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে, যেখানে তারা মনে করছেন এটি তাদের সময়।

অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডানপন্থী নেতারা এই বামমুখী প্রবণতাকে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তবে এই পরিস্থিতি শুধু নীল (ডেমোক্র্যাট) ও লাল (রিপাবলিকান) দলের সাধারণ লড়াই নয়, বরং ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরেও একটি পরিবর্তন নির্দেশ করে। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) এর প্রার্থীরা ডেমোক্রেটিক পার্টির বাছাইপর্বের বেশ কয়েকটি নির্বাচনে প্রতিষ্ঠানপন্থীদের পরাজিত করে আলোচনায় এসেছেন।

এই প্রগতিশীল প্রার্থীদের বিজয় মূলত শহুরে ও শিক্ষিত ভোটারদের সমর্থনে এসেছে। মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদ প্রাক্‌নির্বাচনী জরিপে অনেক এগিয়ে থাকলেও মাত্র দেড় হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তিনি ইসরায়েলের একজন কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।

এল-সাইয়েদকে পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী লবি এবং ডেমোক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্ট প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে তাকে আটকাতে এই লবি আরও বেশি অর্থ ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উইসকনসিনে ডিএসএর প্রার্থী ফ্রান্সেসকা হং জরিপে ১৫ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত একজন মধ্যপন্থী প্রার্থীর কাছে হেরে যান।

হং ধর্মীয় ছুটি বাতিল, সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং পুলিশ ও কারাগার তুলে দেওয়ার মতো কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই প্রস্তাবগুলো প্রগতিশীলদের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি করে, যার ফলে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাই প্রশ্ন উঠেছে যে, বাছাইপর্বে দলের নিজস্ব সমর্থকদের ভোটে জিতলেও এল-সাইয়েদের মতো বামপন্থী প্রার্থীরা সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন কিনা। তাদের ‘ইলেকটেবল’ বা নির্বাচনযোগ্যতা নিয়েও আলোচনা চলছে।

প্রার্থীর নিজস্ব গুণাগুণের পাশাপাশি ‘ইলেকটেবিলিটি’র বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মিশিগান ও উইসকনসিনের ঘটনায় দেখা গেছে, প্রগতিশীল প্রার্থীরা শহুরে ভোটার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং শ্বেতাঙ্গ উদারপন্থীদের সমর্থন পেলেও নিম্ন আয়ের হিস্পানিক ও আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি। এই আপাতবৈপরীত্য সত্ত্বেও প্রগতিশীলদের আবির্ভাব মার্কিন রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

বর্তমানে সিনেট ও কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিটি কাউন্সিল পর্যন্ত সারা যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ৩৫ জন ডিএসএ প্রার্থী হয় জয়ী হয়েছেন অথবা জয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। ডিএসএর বাইরে থাকা প্রগতিশীল প্রার্থীদের ধরলে এই সংখ্যা দ্বিগুণ। এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রগতিশীলেরা কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্ব অস্বীকার করে পাল্টা প্রার্থী দিচ্ছেন এবং জয় ছিনিয়ে আনছেন। দলের পুরোনোপন্থী নেতারা মনে করেন, বাছাইপর্বে জিতলেও সাধারণ নির্বাচনে এই প্রগতিশীলদের জয় অসম্ভব। তাদের মতে, দলের নাম ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের জয় নিশ্চিত করবেন।

প্রগতিশীলদের ঠেকাতে ডেমোক্রেটিক-সমর্থিত ‘থার্ড ওয়ে’ নামে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইতিমধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। অনেকে তাই বলছেন, রিপাবলিকানদের ঠেকানোর বদলে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন। ডিএসএ একটি আলাদা দল নয়, বরং ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের একটি উপদল।

তাদের দাবি, দলের পুরোনো নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে পারছেন না এবং তারা এখনো কর্পোরেট লবির কাছে সীমাবদ্ধ। ইসরায়েলপন্থী লবির বিরুদ্ধেও তারা কোনো কথা বলতে পারছেন না। প্রগতিশীলরা মনে করেন, এখন পুরোনো নেতৃত্বকে সরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে বামঘেঁষা রাজনীতির এই উত্থান অনেকের কাছে বিস্ময়কর। সাম্প্রতিক একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ ‘সমাজতন্ত্রের’ সমর্থক। তবে নবীন মার্কিন ভোটারদের কাছে সমাজতন্ত্রের ধারণা প্রচলিত ধারণার থেকে ভিন্ন।

তারা বাজার অর্থনীতি বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার বিরোধী নন। তাদের আপত্তি খোলাবাজারের নামে গড়ে ওঠা বৈষম্যের পাহাড় নিয়ে। তাদের বক্তব্য, দেশের মোট সম্পদের ৩১ শতাংশ মাত্র ১ শতাংশ অতিধনীর হাতে। অর্থনীতি বা রাজনীতি, সব প্রশ্নে এই অতিধনীরাই সিদ্ধান্ত নেন, যা তারা অনৈতিক বলে মনে করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...