ধর্মপশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে মাইক অপসারণ অভিযান
পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে মাইক অপসারণ অভিযান
পশ্চিমবঙ্গে মসজিদ ও মন্দিরের লাউডস্পিকার অপসারণের অভিযান শুরু হয়েছে, যা নিয়ে রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে মসজিদ ও মন্দিরের লাউডস্পিকার অপসারণের অভিযান শুরু হয়েছে। রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসন এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই অভিযানকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ইতিমধ্যে চার হাজারেরও বেশি মসজিদের মাইক খুলে ফেলা হয়েছে। এছাড়া প্রায় এক হাজারেরও বেশি মন্দির থেকে লাউডস্পিকার অপসারণ করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই উদ্যোগকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, মাইক অপসারণের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আইনি এবং বৈষম্যহীন। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার নতুন কোনো আইন তৈরি করছে না। কলকাতা হাইকোর্টের ২০২০ ও ২০২২ সালের পুরোনো নির্দেশ এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন শুধু মসজিদের কথা বলা হচ্ছে, মন্দিরের নাম কেন বলা হচ্ছে না। তার মতে, ধর্মীয় স্থান মানে মসজিদ, মন্দির সবই হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের নির্দেশ মেনেই মোট ৪ হাজার ২০৩টি মসজিদ এবং ১ হাজার ৯৬টি মন্দির থেকে মাইক সরানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধর্মীয় স্থানগুলোতে কোনো জোরজবরদস্তি করা হয়নি। পুলিশ আদালতের নির্দেশ মেনে দায়িত্ব পালন করছে এবং সমস্ত কমিটির লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশাসনকে সহযোগিতা করছেন।
তবে কলকাতার নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ শফিক কাসমিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতারা ভিন্ন অভিযোগ করেছেন। তারা জানান, কোনো প্রকার লিখিত সরকারি আদেশ বা নোটিশ ছাড়াই স্থানীয় পুলিশ শুধু মৌখিকভাবে মাইক খুলে ফেলার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছে। মাওলানা শফিক কাসমি স্পষ্ট করেছেন, সুপ্রিম কোর্ট বা রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের এমন কোনো নির্দেশ বা বিজ্ঞপ্তি নেই যেখানে সব মসজিদ থেকে ঢালাওভাবে মাইক সম্পূর্ণ খুলে ফেলার কথা বলা হয়েছে।
আদালত একাধিক রায়ে উল্লেখ করেছে যে, ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো নাগরিকেরই নিজের ধর্মীয় আচার পালনের নামে অন্যের শান্তি বা স্বাস্থ্য বিঘ্নিত করার আইনি অধিকার নেই। আদালত আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করেছে। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে দিনের বেলা সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
ধর্মীয় নেতাদের মতে, বিদ্যমান আইনে নির্দিষ্ট ডেসিবেল বজায় রেখে মাইক বাজানোর নিয়ম রয়েছে। আইন অনুযায়ী শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না করে সরাসরি মাইক খুলে ফেলতে বলা সম্পূর্ণ বেআইনি। সিপিএম নেতা ও আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য জানান, আজানের মাইক অবশ্যই বাজতে পারে, তবে তা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে হবে। এর বাইরে গিয়ে পুলিশ জোরপূর্বক মাইক সরাতে পারে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে মালদার চাচোল থানা এলাকার একটি মসজিদের মাইক খোলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, চাচোল থানার পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে স্থানীয় যুবকদের মাধ্যমে ওই মসজিদের মাইক খুলে নিচ্ছে। এই ঘটনার পর ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এবং অন্যান্য মুসলিম নেতারা একে বৈষম্যমূলক আখ্যা দেন। তারা আইনি পদক্ষেপ ও কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এছাড়াও তৃণমূল কংগ্রেস থেকে নতুন দল এনসিপিআইতে যোগ দেওয়া তিন মুসলিম সংসদ সদস্য ইউসুফ পাঠান, খলিলুর রহমান ও আবু তাহের খান এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তারা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে না। বরং সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো প্রশাসনের উদ্যোগে উপাসনালয়গুলোর পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে মাইক ও পাবলিক অ্যাড্রেস (পিএ) সিস্টেম অপসারণের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। 'শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা) বিধিমালা, ২০০০' অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করতে হলে পুলিশের অনুমতি নিতে হবে। পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে সাউন্ড লিমিটার ব্যবহার করতে হবে এবং শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মতামত (0)