স্বাস্থ্যনারীদের ডিম্বাণু সংরক্ষণ: পদ্ধতি ও কারণ
নারীদের ডিম্বাণু সংরক্ষণ: পদ্ধতি ও কারণ
নারীরা কেন ডিম্বাণু সংরক্ষণে আগ্রহী হচ্ছেন, এই চিকিৎসাপদ্ধতি কী এবং কীভাবে এটি সম্পন্ন হয়, সেসব তথ্য উঠে এসেছে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা ওসাইট ক্রায়োপ্রিজারভেশন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি যেখানে নারীর ডিম্বাশয় থেকে নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ডিম্বাণুগুলো অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় হিমায়িত অবস্থায় দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সন্তান ধারণের জন্য এসব সংরক্ষিত ডিম্বাণু ব্যবহার করে গর্ভধারণের চেষ্টা করা সম্ভব। বিশ্বজুড়ে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং বাংলাদেশেও কয়েক বছর ধরে এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতেই মূলত অনেক নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে থাকে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা হ্রাস পেতে পারে। তুলনামূলক কম বয়সে, যখন ডিম্বাণুর গুণগত মান ভালো থাকে, তখন অনেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখেন।
চিকিৎসাজনিত কারণেও অনেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, তাই এই চিকিৎসার আগে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মেহনাজ মুশতারী সুমি জানান, কেমোথেরাপি ডিম্বাশয়ের অনেক ক্ষতি করে, তাই অনেকেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন।
ডিম্বাশয়ে অস্ত্রোপচার বা প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কোনো চিকিৎসার আগেও চিকিৎসকের পরামর্শে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হতে পারে।
চিকিৎসাজনিত সমস্যা না থাকলেও ব্যক্তিগত কারণেও অনেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ বেছে নেন। কেউ হয়তো পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারের কারণে এখনই সন্তান নিতে চান না। আবার কেউ উপযুক্ত সঙ্গী না পাওয়ায় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে চান। এ ধরনের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগে থেকেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এই পদ্ধতিকে ঐচ্ছিক ডিম্বাণু সংরক্ষণ বলা হয়।
আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, একটি মেয়ে সাধারণত ডিম্বাশয়ে প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পর থেকেই ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে শুরু করে। বয়ঃসন্ধিতে এই সংখ্যা প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখে নেমে আসে। ৩৭ বছর বয়সে ডিম্বাণুর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার এবং ৫১ বছর বয়সে প্রায় এক হাজারে নেমে আসতে পারে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রক্রিয়ার শুরুতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নারীর ডিম্বাশয়ের অবস্থা ও ডিম্বাণুর সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের ফার্টিলিটি চিকিৎসার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, এরপর ওষুধ দেওয়া হয় যাতে ডিম্বাশয়ে একসঙ্গে একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়ে ওঠে।
ডিম্বাণু পরিপক্ব হলে অ্যানেসথেশিয়া বা সেডেশনের মাধ্যমে নারীকে অচেতন বা ঘুমঘুম অবস্থায় রাখা হয়। সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে যোনিপথ দিয়ে একটি সরু সূচ প্রবেশ করিয়ে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে পেটের মধ্য দিয়েও ডিম্বাণু সংগ্রহ করা যেতে পারে। সংগ্রহ করা ডিম্বাণুগুলো ‘ভিট্রিফিকেশন’ পদ্ধতিতে দ্রুত হিমায়িত করা হয়। এরপর তরল নাইট্রোজেনের সাহায্যে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে কোনো নারী সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সংরক্ষিত ডিম্বাণুগুলো হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করে আনা হয়। যেসব ডিম্বাণু অক্ষত থাকে, সেগুলোতে শুক্রাণু প্রবেশ করিয়ে নিষিক্ত করা হয়। গাই’স অ্যান্ড সেন্ট থমাস এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করার পর প্রতি ১০টি ডিম্বাণুর মধ্যে আট থেকে নয়টি টিকে থাকতে পারে। নিষিক্ত ডিম্বাণু ধীরে ধীরে ভ্রূণে পরিণত হলে একটি সরু নলের মাধ্যমে সেটি জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ভ্রূণটি সফলভাবে জরায়ুতে স্থাপিত হলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ডিম্বাণু সংরক্ষণের পাশাপাশি চাইলে সঙ্গীর শুক্রাণু ব্যবহার করে ডিম্বাণু নিষিক্ত করে তৈরি হওয়া ভ্রূণও হিমায়িত করে রাখা যায়। এই পদ্ধতিকে এমব্রিও ফ্রিজিং বলা হয়।
মতামত (0)