শিক্ষানিখোঁজ ৭ ছাত্রনেতার সন্ধান ও ২৪১ নেতাকর্মী গুমের বিচার দাবি ছাত্রশিবিরের
নিখোঁজ ৭ ছাত্রনেতার সন্ধান ও ২৪১ নেতাকর্মী গুমের বিচার দাবি ছাত্রশিবিরের
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে। এতে ২৪১ জন নেতাকর্মী গুমের বিচার ও নিখোঁজ ৭ ছাত্রনেতার সন্ধান দাবি করা হয়।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে গুমের শিকার ২৪১ জন নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার এবং এখনও নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার সন্ধানের দাবি জানানো হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।
গতকাল রোববার দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক এই সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি তার বক্তব্যে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রয়োগ করার অভিযোগ তোলেন।
নূরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ডিবি, ডিজিএফআই, র্যাব ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত বাহিনীকে এসব ঘটনা ঘটাতে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি একটি গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মী রয়েছেন। এটি রাজনৈতিক পরিচয়ে গুমের শিকার মোট ভুক্তভোগীর ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ বলে তিনি দাবি করেন।
নূরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, গত দেড় দশকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো প্রকৃত গুমের ঘটনা সাত শতাধিক। তবে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারের তথ্য এখনো হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তৎকালীন নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মিথ্যা মামলায় ছাত্রশিবিরের ১৭ হাজার ৪৬৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলেও দাবি করেন তিনি।
সাংবাদিক সম্মেলনে গত দেড় দশকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার কয়েকজন নেতাকর্মীর ঘটনা তুলে ধরা হয়। এ সময় জয়পুরহাটের সাবেক জেলা সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর পায়ে গুলি করে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরেন ছাত্রশিবির সভাপতি।
এখনো নিখোঁজ থাকা সাত ছাত্রনেতার বিষয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাস, আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোল থানা সেক্রেটারি রেজওয়ান, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মো. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজার থেকে গুম হওয়া শফিকুল ইসলামসহ সাতজনের কোনো সন্ধান রাষ্ট্র এখনো দিতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে এই সাতজনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং তাদের সন্ধান দাবি করছি।’
সাংবাদিক সম্মেলন থেকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গুম কমিশনে দায়ের করা ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মীর ঘটনাসহ সাত শতাধিক গুম এবং নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতাসহ সব গুমের ঘটনা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গুম ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া নিখোঁজ ছাত্রনেতাদের অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। গুমের শিকার ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দাবিও জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬সহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা গঠনের দাবি করা হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে নিজস্ব তদন্ত দল দিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ারও দাবি জানায় ছাত্রশিবির।
সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, দাওয়াহ সম্পাদক হাফেজ আবু মুসা, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান এবং শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক জাকির হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। গুমের শিকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাসের স্বজনরাও উপস্থিত ছিলেন।
মতামত (0)