অর্থনীতি

নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের মুখেও ইরানের অর্থনীতি: টিকে থাকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের চরম মূল্য

নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের মুখেও ইরানের অর্থনীতি: টিকে থাকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের চরম মূল্য
নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের মুখেও ইরানের অর্থনীতি: টিকে থাকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের চরম মূল্য
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকট সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো ধসে পড়েনি। তবে এই স্থিতি ধরে রাখার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় কোটি কোটি

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টানা পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাত, দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা ধরনের সংকট সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ধসে পড়েনি। তবে এই আপাত স্থিতি ধরে রাখার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষকে; যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমাগত দাম বাড়তে থাকায় কোটি কোটি ইরানির জীবন ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইরানের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বহুমুখী অভ্যন্তরীণ উৎপাদনব্যবস্থা এবং বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্কই দেশটিকে অর্থনৈতিক ধস থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু এই সক্ষমতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে পারেনি, বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশটির অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে দেশটি কেবল তেলের ওপর নির্ভর না থেকে কৃষি, উৎপাদনশিল্প ও সেবাখাতকেও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সীমান্ত বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, সমুদ্রপথে বিকল্প বাণিজ্য এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য উদ্ভাবিত নানা উপায় ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বহুমুখী কৌশলগুলোই দেশটিকে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে সহায়তা করছে, যদিও এর চাপ মূলত সাধারণ জনগণের ওপরই পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি গত বছরের জুন মাস থেকে শুরু হওয়া দুটি যুদ্ধ, দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং কয়েক দফা ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে আয় কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তাদের গ্রাস করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির গবেষক এবং কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ফেলো হাদি কাহালজাদেহ বলেন, কোনো অর্থনীতিকে তখনই ধসে পড়া বলা যায়, যখন সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং রাষ্ট্র কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ বা মৌলিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান, ‘ইরানের অর্থনীতি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি। যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা যত কঠিনই হোক না কেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আমি মনে করি না।’

বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মাংস, ডিম, ভোজ্যতেলসহ অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে, যা আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মান ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েই চলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব, যার কারণে নতুন পণ্যের সরবরাহেও মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

কাহালজাদেহর মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক কৌশল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘এভাবে অর্থনীতিকে সচল রাখা সম্ভব হলেও এর সবচেয়ে বড় চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ পরিবারের ওপর, যাদের জন্য প্রতিদিনের জীবনধারণ কঠিন হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরও বলেন, পরে সরকার ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে সেই চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করে, যা টিকে থাকার একটি ব্যয়বহুল উপায় হলেও অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধসে পড়া থেকে রক্ষা করছে।

বর্তমানে ইরানে মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১০০ ডলারেরও কম, যা জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকার প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য নগদ সহায়তা এবং ইলেকট্রনিক কুপন দিলেও, সেই সহায়তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় বলে অনেকেই মনে করছেন। অন্যদিকে, ইরানের সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় দেশটির ১২টি সেতু ও দুটি সুড়ঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোরও কিছু অংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।

মোহাজেরানি দাবি করেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং আগে শিল্পকারখানায় সপ্তাহে তিন দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা থাকলেও তা কমিয়ে দুই দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিল-সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউট-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য। তারা জানিয়েছে, পাঁচ বছর আগে দেশটির ৩০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতেন, কিন্তু চলতি বছরে সেই হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে এবং তা এখনো বাড়ছে, যা দেশের সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। জার্মানির ফিলিপস ইউনিভার্সিটি মারবুর্গ-এর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফরজানেগানের মতে, ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকট হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, যা দীর্ঘদিনের সমস্যা।

অধ্যাপক ফরজানেগান বলেন, তেল থেকে আসা বিপুল আয় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে আড়াল করেছে, যার ফলে সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়নি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, বেসরকারি খাত দুর্বল হয়েছে এবং উদ্ভাবন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গতি কমেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোই এখন নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ইরানের জেনারেল ইন্সপেকশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জাবিহুল্লাহ খোদাইয়ান সম্প্রতি জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তেল বিক্রির অর্থ দেশে ফেরানোর দায়িত্ব পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

খোদাইয়ান দাবি করেছেন, এসব ব্যক্তির কাছে অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে এবং এর মধ্যে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অপব্যবহার করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি জানান, অভিযুক্তদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আবার কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন; তাঁদের একজনের বিরুদ্ধে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্তদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, যা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। খোদাইয়ান আরও জানান, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ২০ হাজারের বেশি রপ্তানিকারক এখনো প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ইউরো রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনেননি, যা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

হাদি কাহালজাদেহর মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ইরানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যার ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘২০১১ সাল থেকেই ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণি সংকুচিত হতে শুরু করেছে, যা এখন আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।’ এই সংকোচন সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একলাফে ৪ দশমিক ১৪ ডলার বা ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ২৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩ দশমিক ৬৯ ডলার বা ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৯৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, রাশিয়া ও ইরানের ওপর আগের চেয়েও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি দ্বিদলীয় বিল অনুমোদন পেয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেনেটে বিরল এক দ্বিদলীয় ভোটাভুটিতে ৮৬-১২ ব্যবধানে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে, যা ইউক্রেইন ও পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দুটি দেশের অর্থনীতিকে আরও চেপে ধরার পথ সুগম করেছে। এই বিলের আওতায় রাশিয়া এবং রুশ তেল ও গ্যাসের ক্রেতা দেশগুলো কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে এবং ইরানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও বিস্তৃত হবে, যা তাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে।

এই বিলটির অন্যতম রূপকার, সাউথ ক্যারোলাইনার প্রয়াত রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ইউক্রেইন যুদ্ধে রাশিয়াকে সাজা দিতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, উভয় শিবিরেরই এটিতে জোরালো সমর্থন ছিল। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিলটিতে সবুজ সংকেত দেন, তবে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা জোরদার করার বিষয়টি এতে যুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বিলটির আরেক সহ-লেখক ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল জানান, রুশ জ্বালানি কিনে যেসব দেশ মস্কোর যুদ্ধ তহবিলে অর্থ জোগাচ্ছে, বিশেষ করে চীন ও ভারতকে জবাবদিহির আওতায় আনাই এই আইনের মূল লক্ষ্য।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্পষ্ট করে বললে, এখানে চীন ও ভারতই প্রধান লক্ষ্য, কারণ তারা বিপুল পরিমাণ রুশ তেল ও গ্যাস কিনছে। তিনি আরও যোগ করেন, তারা রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে জ্বালানি জোগাচ্ছে এবং বিশ্বমঞ্চে আমাদের কোনো উপকারে আসছে না। সেনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান সেনেটর রজার উইকার বিলের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, পুতিন সাধারণ মানুষ বা নিজ দেশের সেনাদের জীবন পরোয়া করেন না, তবে তিনি তার যুদ্ধযন্ত্রের শক্তিকে গুরুত্ব দেন, যা দাঁড়িয়ে আছে জ্বালানি বিক্রির টাকার ওপর।

নতুন এই আইনের আওতায় রুশ কর্মকর্তা, অলগার্ক, তাদের পরিবারের সদস্য এবং রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তাকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আনা হবে। এছাড়া সস্তা অপরিশোধিত তেল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত রাশিয়ার গোপন ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরও থাকবে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায়। একই সঙ্গে এই বিলে ট্রাম্পকে রুশ তেল-গ্যাস কেনা শীর্ষ পাঁচটি দেশ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্যকারী দেশগুলোর পণ্যে উচ্চহারে (১০০ শতাংশ পর্যন্ত) শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত একটি আইনি ধারা নবায়ন করা হয়েছে, যা চলতি বছরের শেষ দিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল এবং এটি ইরানের আর্থিক ও অস্ত্র খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করবে।

বিলটি বিপুল ভোটে প্রাথমিক অনুমোদন পেলেও কিছু ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এর কঠোর বিরোধিতা করেছেন, যার মধ্যে ১০ জন ডেমোক্র্যাট, স্বতন্ত্র সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং রিপাবলিকান সেনেটর র‍্যান্ড পল বিলটির বিপক্ষে ভোট দেন। বিরোধীদের মূল আপত্তি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নিয়ে, কারণ সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের একক শুল্ক ক্ষমতার লাগাম টানার পর এই বিলে তাকে আবার সেই ঢালাও ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। সেনেটর পিটার ওয়েলশ বলেন, কোন দেশকে সাহায্যকারী হিসেবে গণ্য করা হবে বা কার ওপর শুল্ক আরোপ করা যাবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা এই বিলে নেই। এটি মূলত প্রেসিডেন্টের হাতে যেকোনো দেশকে যেকোনো অজুহাতে শুল্ক আরোপ করার ঢালাও ক্ষমতা তুলে দেওয়া।

সেনেটর রাফায়েল ওয়ারনক ভোটাভুটির আগে জানান, বিলে ট্রাম্পকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ দেওয়া হলেও পুতিনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে তিনি এতে সম্মতি দিয়েছেন। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে; কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর আবারও ইরানে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, বুধবার রাতে ইরানজুড়ে বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং ইস্টার্ন টাইম থেকে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর আগের দিন ইরানের হামলার চেষ্টার জবাবে এই শক্তিশালী হামলা চালানো হয়েছে, যা সংঘাতকে আরও ঘনীভূত করছে।

হামলার ফলে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ এতে জড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, হামলার সময় ইরানের কেশম, কিশ, বন্দর আব্বাস, আবাদান ও বুশেহর এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর আগে বুধবার মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর দামিয়েত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি গ্যাস সংরক্ষণ ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বাহিনী পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালায়, অন্যদিকে জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরাক ও মিসরে সাম্প্রতিক এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যের আরও দেশকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। এর আগে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবারই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এবার আমাদের পালা। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে খুব কঠোরভাবে আঘাত করার হুঁশিয়ারি দিলেও কূটনৈতিকভাবে শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এদিকে ইরান নিশ্চিত করেছে, তারা জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি, বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ যৌথভাবে পরিচালনার জন্য ওমানের দেওয়া প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইউবিএস-এর বিশ্লেষক জিওভানি স্টাউনোভো বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে তেলের দাম আবার বাড়ছে।’ এছাড়াও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের কথাও বিবেচনা করছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত নিরসনের আশা ফিকে হয়ে আসায় নিকট ভবিষ্যতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ৮০ থেকে ১০০ ডলারের ঘরেই ওঠানামা করতে পারে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বহুমুখী উৎপাদনব্যবস্থা এবং বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্কের ওপর ভর করে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও অর্থনৈতিক ধস এড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই টিকে থাকার পেছনে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এক বিশাল মূল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো বহুমুখী চাপগুলো ইরানের অর্থনীতিকে ক্রমাগত দুর্বল করে চলেছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গঠনমূলক ভূমিকা অপরিহার্য, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং দেশের অর্থনীতি সত্যিকারের টেকসই পথে এগোতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...