অর্থনীতিনীতি সুদহার কমালো কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ঋণের সুদ হ্রাসের প্রত্যাশা
নীতি সুদহার কমালো কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ঋণের সুদ হ্রাসের প্রত্যাশা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এতে ঋণের সুদ কমবে বলে ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, তবে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মূল্যস্ফীতি নিয়ে সতর্ক।
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন নীতি সুদহার আগামী রোববার থেকে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নীতি সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে। এতে ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ঋণের সুদ কমলে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, এমনিতেই সুদহার কমে আসছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ কমানোর ফলে তা আরও কমে আসবে। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ফলে আমানতের সুদও কমবে। কোনো ব্যাংকের ঋণের সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
উদ্যোক্তারা এই নীতি সুদহার কমানোকে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁরা জানান, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উঠেছে, যা দিয়ে ব্যবসায় মুনাফা করা কঠিন। নতুন বিনিয়োগ ব্যাংক ঋণের সুদহারের পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রাপ্তি, রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে ব্যবসা সহজ করার বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে ব্যাংকঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগ কাজে দেবে।
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে কিছুটা সতর্কতা রয়েছে। দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে আসেনি। টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের সুদের হার কমলে ঋণের প্রবাহ বাড়তে পারে। এতে অর্থের সরবরাহ বাড়লে নতুন করে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁরা মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণের সুদ কমানো হলেও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদহার একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, স্থিতিশীলতা, করনীতি, ঘুষ-দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও এর সঙ্গে জড়িত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অবলম্বন করে আসছিল। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিলেও সে সময় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন। এরপর গত ৩০ জুন চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়।
উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে শ্লথগতি চলছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৯৮ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
নতুন বিনিয়োগেও আশাব্যঞ্জক তথ্য নেই। বিদায়ী অর্থবছরে ১.৮৮ বিলিয়ন ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২.৩৪ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে সুদহার কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদহারে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ দেয়, সেটাই হচ্ছে নীতি সুদহার বা রেপো রেট। এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রানীতির একটি অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত।
মতামত (0)