সারাদেশপদ্মার ভাঙনে বিলীন শতাধিক বিঘা ফসলি জমি, হুমকিতে বসতবাড়ি ও স্থাপনা
পদ্মার ভাঙনে বিলীন শতাধিক বিঘা ফসলি জমি, হুমকিতে বসতবাড়ি ও স্থাপনা
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় পদ্মার তীব্র ভাঙনে এক সপ্তাহে ১১০ বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। শতাধিক বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ও কাওয়ালজানি এলাকায় পদ্মা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহে তীরের প্রায় ১১০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এসব জমিতে ধান, পাট, পেঁয়াজ ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ হতো।
নদীর ভাঙনে স্থানীয় মুন্সি বাজার, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মসজিদ, কবরস্থান এবং একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রায় ১০০ পরিবারের বসতবাড়িও ভাঙনের কবলে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বাড়া-কমার সময় ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে।
৮৫ বছর বয়সী আব্দুস সামাদ সরদার জানান, তিনি তিন দশকে দুইবার পদ্মার ভাঙনে বসতঘর ও জমি হারিয়েছেন। প্রথমবার ৩০ বছর আগে দেবগ্রামের বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বেথুরী এলাকায় নতুন বাড়ি করেন। সেখানেও ১৮ বছর আগে ভাঙনে সব হারান। বর্তমানে কাওয়ালজানি গ্রামে তাঁর অবশিষ্ট জমি ও বাড়িও ভাঙনের মুখে। তিনি বলেন, 'এখন ভাঙলে যাওনের আর কোনো জায়গা নাই।'
গত বৃহস্পতিবার দেবগ্রাম ও কাওয়ালজানি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের সঙ্গে বড় বড় ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। এতে কৃষিজমি দ্রুত ভেঙে পড়ছে। বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্রোত ও ঢেউয়ের টানে সেগুলো নদীতে ধসে যাচ্ছে।
নদীর কিনারেই একটি কবরস্থান রয়েছে, যা বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে। ২৭ নম্বর বেথুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৪ নম্বর কুশাহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভাঙনের মুখে। ২৭ নম্বর বেথুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদী থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে অবস্থিত।
নদীপাড়ের বাসিন্দা লোকমান সরদার জানান, তাঁর ১০ বিঘার মতো জমি ভাঙনে বিলীন হয়েছে, এখন মাত্র এক বিঘা জমি অবশিষ্ট আছে। তাঁর ছেলে, দাদা-দাদির কবর যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যাবে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে নদীশাসনের দাবি জানান।
১৯৭৩ সালে স্থাপিত ২৭ নম্বর বেথুরী সরকারি বিদ্যালয়টি এর আগে দুইবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। গত বছর বিদ্যালয় থেকে নদী প্রায় এক কিলোমিটার দূরে থাকলেও এ বছর এটি সরাসরি ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ সরদার সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁদের রিলিফ-স্লিপের প্রয়োজন নেই।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান জানান, ভাঙনে এক সপ্তাহে দেবগ্রাম এলাকার প্রায় ১২০ মিটার অংশ বিলীন হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ৭২ মিটার এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার জন্য একটি প্যাকেজের প্রস্তাব পাউবোর প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর আগে বর্ষার শুরুতে একটি প্যাকেজে ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। গত বছর দুটি প্যাকেজে ১২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা অপরিকল্পিত ও দায়সারা বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কারণে টেকসই সমাধানের অভাব দেখছেন। দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম এলাকার নদীশাসন আন্দোলনের সদস্যসচিব জামাল মুন্সি বলেন, ভরা বর্ষায় ভাঙন প্রকট হলে তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলা হয়। নদীর তীর ঘেঁষে উপরিভাগে জিও ব্যাগ পড়লেও স্রোতের টানে নিচের মাটিসহ ধসে পড়ে। তিনি অভিযোগ করেন, সারা বছর শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানানো হলেও কেউ কর্ণপাত করেন না।
মতামত (0)