সারাদেশরাউজানে যুবদল কর্মী খুন: প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েও অধরা সন্ত্রাসী রায়হান
রাউজানে যুবদল কর্মী খুন: প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েও অধরা সন্ত্রাসী রায়হান
চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল কর্মীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের দশ দিন আগে এক সন্ত্রাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানের কেরানীহাট বাজারে মোহাম্মদ করিম (৩৫) নামের এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে একদল অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। স্থানীয়রা আতঙ্কে প্রায় এক ঘণ্টা সড়কের ওপর থাকা লাশ সরিয়ে নেওয়ার সাহস পাননি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দশ দিন আগে স্থানীয় সন্ত্রাসী মো. রায়হান পুলিশের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দিয়েছিলেন। গত ২০ আগস্ট তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ লিখেছিলেন। এর চার দিন পর অনুসারীদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘ছোট ভাইয়েরা সবাই রেডি হও। রাউজানে কার কার ঘরে ভাঙচুর করা লাগবে লিস্ট করো।’
হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় ঘণ্টা পর গত শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে রায়হান নিজের ফেসবুকের স্টোরিতে গুলি ছোড়ার একটি ভিডিও আপলোড করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসী রায়হান পুলিশকে ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে দিচ্ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে করিম কেরানীহাট বাজারে ঢোকার সময় চার–পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে আসা একদল অস্ত্রধারী তাঁকে ঘিরে ফেলে। একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় কোপ দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। মৃত্যু নিশ্চিত করে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করিমের পেট, ঊরু ও নিতম্বে গুলি লাগে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে যায়। ঘাড় ও কপালেও কোপের চিহ্ন ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ছিল না। এই ঘটনায় গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা ছিল। তিনি একাধিকবার কারাগারেও ছিলেন। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, একসময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন করিম, পরে বিদেশে যান এবং দেশে ফিরে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
করিমের স্ত্রী বিলকিস আকতার জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে কয়েকজন সন্ত্রাসী করিমকে গ্রামের একটি বৈঠকে বসার জন্য ফোন করে ডাকছিলেন। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাড়ি থেকে বের হন এবং রাতে তাঁর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার খবর পান তাঁরা।
রায়হান বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও রায়হানের নির্দেশের কথা মামলার আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীতে পুলিশের অভিযানের সময় একটি বাসার ছাদ থেকে রায়হান পালিয়ে যান বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২০টি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ঘটেছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য হুমকি এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক মো. নাজিমুল হক বলেছেন, রাউজান ও আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চারটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে এক প্লাটুন সদস্য রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা বসানো এবং থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারির প্রস্তাবও রয়েছে। রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যদের টহলেও রাখার কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেছেন, রাউজানের সব কটি হত্যাকাণ্ডে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে এবং অস্ত্র উদ্ধার করেছে। রায়হানসহ অন্য জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে অভিযান চলছে। সম্প্রতি জামিনে বের হওয়া সন্ত্রাসীদের ওপরও পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে করিম হত্যার পেছনে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান পুলিশ সুপার। তাঁর ভাষ্য, মাদকের বিরোধকে কেন্দ্র করে করিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য ও সোর্সব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার। তিনি মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সোর্স মানি যথাসময়ে দেওয়ার, পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার এবং সন্ত্রাসীদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার কথা বলেছেন।
মতামত (0)