জাতীয়রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজের অঙ্গীকার ১৫ দেশ ও ইইউর
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজের অঙ্গীকার ১৫ দেশ ও ইইউর
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের নবম বর্ষপূর্তিতে ১৫টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। তারা এই পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
১৫টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের নবম বর্ষপূর্তিতে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে মিয়ানমারে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। এই দেশগুলো ও ইইউ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পথ খুঁজতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কসোভো, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য এই ১৫টি দেশের সঙ্গে ইইউর যৌথ বিবৃতিটি ঢাকায় ফরাসি দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয়। বিবৃতিতে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের গণহারে বাস্তুচ্যুতির পর ৯ বছর পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে।
বিবৃতিতে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুতি ও দুর্ভোগের মধ্যেও যে দৃঢ়তা, সাহস আর মর্যাদা ধরে রেখেছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার উদারতার জন্য বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার অধিকার রয়েছে বলেও জানানো হয়।
তবে রাখাইনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানবিক সংকট বাড়ছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে। ক্রমেই বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতা, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মানবিক সহায়তা বিতরণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ঘটনা বিদ্যমান সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল ক্রমেই বাড়ছে, যা বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণহানির কারণ হচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন আর দেশটির সরকারের হাতে নেই। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং সামরিক বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রাখাইনে আরাকান আর্মি একটি প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
মিয়ানমার সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশে থাকা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা, তবে তাদের ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকার করে ‘বাঙালি’ শব্দটি আবারও সামনে আনা হয়েছে। দেশটি প্রত্যাবাসনের কোনো সময়সীমা দেয়নি, বরং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশ যে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা দিয়েছে, তার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে এবং ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করাটা মিয়ানমারের পুরোনো অবস্থান, কারণ দেশটি ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। তাদের নাগরিকত্বের অধিকারও অস্বীকার করা হয়েছে। এই অবস্থান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা যোগ করে।
বিবৃতিতে ১৫টি দেশ ও ইইউ বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হলে কৌশলগত ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে মোকাবিলা করতে হবে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করা অপরিহার্য।
সফলভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে হলে তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে রাখাইনে ফিরে রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও সম্প্রদায় নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে। এই দেশগুলো ও সংগঠন মনে করে, এই পদক্ষেপগুলো প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।
১৫টি দেশ ও ইইউ জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পথ খুঁজতে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাবে। তত দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে এবং তাদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করা হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার বিষয়টি শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর নির্ভর করে না। তাদের কাছে সহায়তা কীভাবে আরও কার্যকর উপায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য স্থানীয় নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ সমর্থন করা হয়েছে। সহায়তা পরিকল্পনা ও সেসব বাস্তবায়নে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নেতৃত্বাধীন সংগঠনের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষেও তারা।
রোহিঙ্গাদের জীবন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার কেন্দ্রে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর থাকতে হবে। সংকটটি দশ বছরে পা দেওয়ায়, রোহিঙ্গাদের যাতে কেউ ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই দেশগুলো ও ইইউ রোহিঙ্গাদের কণ্ঠ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে এবং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মেলবন্ধনে রোহিঙ্গাদের জন্য বৈশ্বিক সমর্থন ধরে রাখার গুরুত্বও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।
মতামত (0)