প্রযুক্তিশব্দতরঙ্গে উড়বে নতুন খুদে রোবট, প্রয়োজন হবে না ইঞ্জিনের
শব্দতরঙ্গে উড়বে নতুন খুদে রোবট, প্রয়োজন হবে না ইঞ্জিনের
প্রকৌশলীরা শব্দতরঙ্গের শক্তিতে পরিচালিত এক নতুন খুদে রোবট উদ্ভাবন করেছেন, যার জন্য কোনো মোটর বা ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয় না।
প্রকৌশলীরা একটি নতুন খুদে রোবট উদ্ভাবন করেছেন যা চলতে কোনো মোটর বা ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয় না। এই রোবটটি সম্পূর্ণরূপে শব্দতরঙ্গের শক্তিতে কাজ করে। এটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ শুনলেই এর ভেতরের ফাঁপা ঘরগুলো কাঁপতে শুরু করে এবং তখন বাতাসের এক শক্তিশালী ঝাপটা বাইরে বেরিয়ে আসে। বাতাসের এই ধাক্কা কাজে লাগিয়ে ছোট নৌকা পানিতে ভেসে চলতে পারে, এমনকি কোনো খুদে রোবট মাটি ছেড়ে শূন্যেও ভেসে উঠতে পারে।
বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে গত ১২ আগস্ট বিজ্ঞানীদের এই উদ্ভাবনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা টু-ফোটন প্রিন্টিং নামে একটি বিশেষ থ্রিডি-প্রিন্টিং কৌশল ব্যবহার করেছেন। হেলমহোল্টজের মূল সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা ছোট ছোট ফাঁপা কাঠামো তৈরি করেছেন।
জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হারমান ফন হেলমহোল্টজ ১৮৫৬ সালে বাদ্যযন্ত্রের সুর মেলানোর কাজ করার সময় হেলমহোল্টজ রেজোন্যান্স আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, কোনো ফাঁপা জায়গায় আটকে থাকা বাতাস কেঁপে উঠলে সেখান থেকে অল্প পরিমাণ বাতাস বাইরে বেরিয়ে আসে। বাদ্যযন্ত্রের সাধারণ বাতাসে এই বায়ুপ্রবাহের শক্তি খুব কম থাকে।
তবে গবেষকেরা মনে করেন, বাতাসের চাপ বাড়ানো গেলে সেই ধাক্কাকে অনেক শক্তিশালী করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে, এই ফাঁপা প্রযুক্তিকে খুব ছোট করে ফেললে তা চালাতে আলট্রাসনিক কম্পাঙ্কের শব্দ লাগবে। এই শব্দ মানুষের কানে শোনা যায় না এবং একে খুব নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট জায়গাতেও প্রয়োগ করা যায়। এর ফলে মানুষের কানে বিরক্তিকর বা ক্ষতিকর জোরালো শব্দ তৈরি না করেই রোবটে শক্তিশালী ধাক্কা তৈরি করা সম্ভব হবে।
গবেষক দলটি প্রায় ৫ সেন্টিমিটার বা ২ ইঞ্চি আকারের ছোট নৌকা তৈরি করেছে। এগুলোতে একাধিক রেজোনেটর যুক্ত ছিল, যা নির্দিষ্ট কোনো কম্পাঙ্কের তরঙ্গকে ধারণ করে তার শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রতিটি রেজোনেটর যেন আলাদা আলাদা শব্দের কম্পাঙ্কে কাজ করতে পারে, সেভাবে এগুলো টিউন করা হয়েছিল এবং সেগুলোর মুখ ভিন্ন ভিন্ন দিকে ঘোরানো ছিল। পাশের একটি স্পিকারের শব্দের সুর বা পিচ পরিবর্তন করেই গবেষকেরা নৌকাগুলোকে ইচ্ছেমতো ডানে, বাঁয়ে কিংবা সোজা সামনে চালিয়ে নিতে সক্ষম হন।
বিজ্ঞানীরা এর চেয়েও অনেক ছোট আকারের যন্ত্র তৈরি করেন, যার কয়েকটির আকার ছিল মাত্র ১ মিলিমিটার বা ০.০৪ ইঞ্চি। তাঁরা এই খুদে উড়োজাহাজ দুটি ভিন্ন উপায়ে ওড়াতে সক্ষম হন। এর মধ্যে কিছু উড়োজাহাজ রকেটের মতো ঠিক নিচের দিকে বাতাস ঠেলে ধাক্কা তৈরি করত, তবে সেই ধাক্কা তৈরির মূল শক্তি জোগাতো ওই শব্দতরঙ্গ। আবার অন্য উড়োজাহাজগুলো হেলিকপ্টারের মতো ওড়ার জন্য নিজেদের গায়ের সঙ্গে থাকা অতি ক্ষুদ্র ব্লেডগুলো ঘোরাত, সেই ব্লেড ঘোরানোর ক্ষমতাও আসত সরাসরি শব্দতরঙ্গ থেকেই।
সুইজারল্যান্ডের একোল পলিটেকনিক ফেডেরাল দ্য লোজান বা ইপিএফএলের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও গবেষণাপত্রের সহলেখক অধ্যাপক সেলমান সাকার একটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রচলিত বিদ্যুৎ ও মোটর ব্যবস্থার তুলনায় এই নতুন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর আকার। একে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারে তৈরি করা সম্ভব। সাধারণ কোনো মোটর তৈরি করতে হলে চুম্বক, তারের কয়েল ও শ্যাফটের মতো উপাদান প্রয়োজন হয়। ফলে চাইলেও মোটরকে একটি নির্দিষ্ট মাপের চেয়ে ছোট করা যায় না। কিন্তু এই রেজোনেটরগুলো কেবল সুনির্দিষ্ট আকৃতির ফাঁপা গহ্বর হওয়ায় এগুলোকে অতি ক্ষুদ্র করার ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশের কোনো বাধা নেই।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণাপত্রে একটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ছোট কোনো বস্তুকে কোনো স্পর্শ ছাড়াই শূন্যে ঘোরানো ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া এমন নমনীয় পৃষ্ঠ বা উপাদান তৈরি করা যাবে, যা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ শুনলেই নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের আকৃতি বদলাতে পারবে। এই প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানেও প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
মতামত (0)