নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ‘সৈয়দপুর রেলবাজার’ দেশের হালকা প্রকৌশলশিল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রায় ৫০০ ওয়ার্কশপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প দেশজুড়ে ‘দ্বিতীয় জিনজিরা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই ওয়ার্কশপগুলোতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির সনদ বা জটিল ব্লুপ্রিন্ট ছাড়াই কারিগররা যন্ত্রাংশ তৈরি করেন।
কারখানার ভেতরে লোহা পেটানোর শব্দ এবং ওয়েল্ডিংয়ের আগুনের ফুলকি এক কর্মব্যস্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। মেঝেতে পুরোনো জাহাজের স্ক্র্যাপ, মরচে পড়া লোহা আর মেটাল শিট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। এখানকার কারিগররা দেশি বা বিদেশি যেকোনো আধুনিক যন্ত্রের একটি নমুনা দেখে হুবহু যন্ত্র তৈরি করতে সক্ষম।
মামুন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের এক কারিগর জানান, তারা মডেল বা স্যাম্পল পেলে যেকোনো কিছু বানিয়ে দিতে পারেন। প্রকৌশলবিদ্যায় যেখানে থ্রিডি মডেল বা অটোক্যাডের ব্লুপ্রিন্ট প্রয়োজন হয়, সেখানে সৈয়দপুরের কারিগররা তাঁদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও বংশপরম্পরায় পাওয়া অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেন। অনেক সময় যশোর বা বগুড়া থেকে আনা সাধারণ নকশা দেখেও তাঁরা যন্ত্রের রেপ্লিকা তৈরি করেন।
বিদেশ থেকে আমদানি করা আধুনিক কৃষি বা শিল্প যন্ত্রপাতি তিন গুণ বেশি ব্যয়বহুল হয়। সৈয়দপুরের কারিগররা দেশীয় প্রযুক্তিতে অত্যন্ত কম খরচে সেই যন্ত্রগুলো তৈরি করে দিচ্ছেন। ১৮৭০ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে ব্রিটিশরা সৈয়দপুরে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করে। সেই কারখানার অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ শ্রমিকেরা পরে নিজেদের উদ্যোগে ছোট পরিসরে মেকানিক্যাল পার্টস তৈরির ব্যবসা শুরু করেন, যা পাকিস্তান আমলে শুরু হয়ে স্বাধীনতার পর মহিরুহে পরিণত হয়।
এই শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ভারত থেকে আমদানি করা মেটাল শিট, চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পের পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ, অ্যাঙ্গেল, রড এবং স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত পুরোনো লোহা ব্যবহৃত হয়। এই স্ক্র্যাপ লোহা গলিয়েই তারা বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি করেন। তাদের উদ্ভাবনী পণ্যের মধ্যে রয়েছে রেলওয়ের ভারী যন্ত্রাংশ যেমন কানেক্টিং রড, হাউজিং, হোস পাইপ, ইঞ্জিন কভার, কাপলিং, বিয়ারিং কভার, ট্রেনের দরজা-জানালা এবং স্ক্রু লিফটিং জ্যাক।



মতামত (0)