অর্থনীতি

সৈয়দপুরের রেলবাজার: এক ঘুমহীন শহরের অবিরাম বাণিজ্য

সৈয়দপুরের রেলবাজার: এক ঘুমহীন শহরের অবিরাম বাণিজ্য
সৈয়দপুরের রেলবাজার: এক ঘুমহীন শহরের অবিরাম বাণিজ্য
নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলবাজার দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে, যা একে একটি ঘুমহীন বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত রেলওয়ে কারখানার ঐতিহাসিক প্রভাব এর পেছনে রয়েছে।

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে দেশের বেশিরভাগ গ্রামীণ বাজারে যখন নতুন করে কর্মব্যস্ততা শুরু হয়, নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র রেলবাজারের চিত্র তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকে। এখানে ভোরের আলো নতুন কোনো শুরুর বার্তা দেয় না; বরং তা রাতের চলমান অবিরাম বাণিজ্য কর্মযজ্ঞেরই একটি ধারাবাহিকতা মাত্র। এই অঞ্চলে দিন-রাতে সমানতালে চলা অন্তহীন ব্যবসায়িক তৎপরতা দেখে মনে হতে পারে এখানকার মানুষজন রাতে মোটেও ঘুমায় না।

মানুষ ঘুমায় না বললে ভুল হবে, তবে এই শহর আসলে কখনো ঘুমায় না। এটি অনেকটা ‘ঘুমহীন শহর, বিনিদ্র বাণিজ্য’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে রাত জেগে চলে প্রাচীন বাজারের বাণিজ্যিক লেনদেন। সম্প্রতি এক সপ্তাহব্যাপী অনুসন্ধানে রেলবাজার ঘিরে গড়ে ওঠা সৈয়দপুরের আদ্যোপান্ত সম্পর্কে জানা গেছে।

চার লাখের বেশি মানুষের এই নগরীতে বহু সংস্কৃতির জনপদে বাংলা ও উর্দু ভাষার এক অপূর্ব মেলবন্ধন শোনা যায়। এটি নামে উপজেলা হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব আর ঐতিহ্যের দিক থেকে দেশের যেকোনো বড় শহরের চেয়ে কম নয়।

১৮৭০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এখানে সুবিশাল রেলওয়ে কারখানা স্থাপিত হয়, যা এই শহরের আধুনিক নগরায়ণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। আজ ২০২৬ সালে এসে এটি কেবল উত্তরের একটি শহরই নয়; বরং এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

সৈয়দপুর নামের উৎপত্তি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক ঐতিহাসিক দলিল না থাকলেও স্থানীয় জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতবাদ অনুযায়ী, সুদূর অতীতে ভারতের কোচবিহার থেকে আগত একটি সম্ভ্রান্ত ‘সাইয়্যেদ’ বা সৈয়দ পরিবার এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এই ধর্মপ্রাণ ও প্রভাবশালী পরিবারটি স্থানীয়ভাবে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করলে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানার্থে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় ‘সাইয়্যেদপুর’। কালক্রমে ভাষাগত বিবর্তনের মাধ্যমে তা আজকের ‘সৈয়দপুর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রশাসনিক বিবর্তনে দেখা যায়, ১৮৭০ সালের আগে সৈয়দপুর ছিল রংপুর জেলার দারোয়ানি থানার অধীন একটি সাধারণ বাজার বা ছোট জনপদ। পরে যখন নীলফামারী মহকুমা গঠিত হয়, তখন ১৮৭০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত এটি নীলফামারী সদর থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ব্রিটিশ প্রশাসন যখন এ অঞ্চলের জনসংখ্যা ও শিল্পের দ্রুত বিকাশ লক্ষ করে, তখন ১৯১৫ সালে সৈয়দপুরকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ থানা হিসেবে উন্নীত করা হয়। এরপর ১৯৫৮ সালের ৯ এপ্রিল সৈয়দপুর পৌরসভা গঠিত হয়।

সৈয়দপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির মূলেই জড়িয়ে আছে এখানকার সুবিশাল রেলওয়ে কারখানা। ১৮৭০ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রায় ১১০ একর জমির ওপর এই রেলওয়ে কারখানা নির্মিত হয়।

সে সময় কারখানার বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য অবিভক্ত ভারতের বিহার, যুক্ত প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার দক্ষ উর্দুভাষী শ্রমিক ও কারিগর নিয়ে আসা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে বিহার ও অন্যান্য প্রদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক উর্দুভাষী মানুষ এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে, যার ফলে শহরের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ অবাঙালি হয়ে ওঠে।

এই কারখানায় ট্রেন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি একসময় নতুন কোচ ও ওয়াগনও উৎপাদন করা হতো। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে হয়ে পুরো ভারতবর্ষ থেকে মানুষ এবং পণ্যের আনাগোনা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজার ছড়িয়ে নগরীর ব্যাপ্তিও বাড়তে থাকে। মূলত তখন রেল কারখানা কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠা বাজার প্রসারিত হতে থাকে।

বাঙালি, বিহারি ও মাড়োয়ারি—এই তিন মিশ্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থানে শহরটিতে এক অনন্য কসমোপলিটন পরিবেশ জন্ম নেয়, যা আজ অবধি এই শহরের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য।

সৈয়দপুরকে ‘রাতের শহর’ বা ‘নিশুতি শহর’ বলার পেছনে রয়েছে রেলওয়ে কারখানার ঐতিহাসিক ও সরাসরি প্রভাব। ব্রিটিশ আমল থেকেই রেলওয়ে কারখানায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা শিফটিং ডিউটি বা তিন শিফটে কাজ চলত।

এখানকার কারখানার হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাত্যহিক ও গভীর রাতের ক্ষুধা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে শহরের দোকানপাট, চায়ের স্টল ও রেস্তোরাঁগুলো গভীর রাত পর্যন্ত, এমনকি সারা রাত খোলা রাখতে হতো। কালক্রমে এটি শহরের একটি স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। অন্যান্য গ্রামীণ বা মফস্বল শহর যখন সূর্যাস্তের পর নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়, সৈয়দপুরে তখন তার দ্বিতীয় পর্বের সক্রিয়তা শুরু হয়। এটি শহরের প্রাণকেন্দ্র ও ইসলামবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...