আন্তর্জাতিক

সৌদি তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা, বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব

সৌদি তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা, বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
সৌদি তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা, বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর এটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশনে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার এই হামলার পর সৌদি সরকার পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এই ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারের জন্য একটি বড় ধাক্কা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মদিনা নগরীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পাম্পিং স্টেশনে হামলার ক্ষত দেখা গেছে, যা ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়েছে।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বা ৭৪৬ মাইল দীর্ঘ। এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন করা তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে এই পাইপলাইন দিয়ে পৌঁছানো হয়। এরপর তেল ট্যাংকারে ভরে সমুদ্রপথে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।

এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ তৈরি করে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর পুরো উপসাগরীয় এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল পরিবহনে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে এই পাইপলাইনের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরাও লোহিত সাগর এলাকায় হামলা জোরদার করেছে।

হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনার পর সতর্কতা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

হামলায় ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো সম্পূর্ণ জানা যায়নি। পাইপলাইনটির কার্যক্রম কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য শোনা যাচ্ছে। এই ঘটনা সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এর আগেই পাইপলাইনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সৌদি আরবের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, রিয়াদ ও পবিত্র মদিনার কাছে দুটি এলাকায় ড্রোন দিয়ে পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।

এর আগে গত মার্চে ইয়ানবুতে সৌদি আরামকো-এক্সন মোবিলের তেল শোধনাগারের কাছে হামলা হয়েছিল। সেই হামলায় লোহিত সাগরের বন্দরটি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ট্যাংকারে তোলার কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। ওই হামলার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে পড়েনি এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তেল পরিবহন স্বাভাবিক হয়েছিল।

তবে ওই হামলা দেখিয়ে দিয়েছিল যে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামোগুলো হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত, ১৯৮১ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনের উদ্দেশ্যে চালু করা হয়।

পাইপলাইনটি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা যায়। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এই পাইপলাইন ব্যবহার করে জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ কমেছে। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে।

এটি জানুয়ারির পর থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সর্বনিম্ন মাসভিত্তিক হিসাব। হুতিদের একের পর এক হামলার কারণে লোহিত সাগরের এ পথে জ্বালানি তেল পরিবহন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব পশ্চিমমুখী পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পাঠানোর পরিমাণ বাড়িয়েছিল। তখন প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে পরিবহন করা হতো, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের চার থেকে পাঁচ শতাংশ।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...