জাতীয়

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন
গতকাল সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়েছে। এতে বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে এবং প্রায় ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগী উপকৃত হবেন।

গতকাল সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। প্রায় এক যুগ পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার।

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। সচিব বা প্রথম গ্রেড থেকে একাদশ গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। দ্বাদশ থেকে বিংশতম গ্রেডের মূল বেতন বেড়েছে ১১৫ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।

এই নতুন বেতনকাঠামোতে প্রায় ২৪ লাখ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী উপকৃত হবেন। এছাড়া, সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এর আওতায় আসবেন। এর ফলে সরকারের বছরে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে।

নতুন বেতনকাঠামো চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এই সময়কালে অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য বড় প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে। বাড়িভাড়াসহ নতুন সব ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চতুর্থ ধাপে যোগ হবে, তবে এই সময়ের মধ্যে আগের ভাতাগুলো চালু থাকবে।

স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের কথা বিবেচনা করে দশম থেকে বিংশতম গ্রেডের চাকরিজীবীদের নতুন বেতন বাস্তবায়নে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব গ্রেডের জন্য প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বর্ধিত মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর হবে। তাঁরাও সব ভাতা পাবেন চতুর্থ ধাপে।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, নবম গ্রেডে মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা, যা নতুন কাঠামোয় দ্বিগুণ হয়ে ৪৪ হাজার টাকা হয়েছে। একজন নতুন চাকরিজীবী চলতি বছরের জুলাইয়ে নবম গ্রেডে যোগ দিলে তাঁর মূল বেতন প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা, এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে তৃতীয় ধাপে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হলে মূল বেতন ৪৪ হাজার টাকা হবে।

২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে ভাতাগুলো কার্যকর হবে। তখন ঢাকায় কর্মরত নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার ৪৪ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে ২২ হাজার টাকা যোগ হবে। চিকিৎসা, শিক্ষাসহায়ক, উৎসব ও অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়ে তখন তাঁর মোট বেতন-ভাতা কমবেশি ৭০ হাজার টাকা হতে পারে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা হওয়ার সুযোগ আছে।

সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি দশম গ্রেড করা হয়েছে। চাকরির শুরুতে এই গ্রেডের পুরোনো মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা ছিল, যা নতুন কাঠামোয় ৩২ হাজার টাকা হবে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা হবে। প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বেড়ে মূল বেতন ২৪ হাজার টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ২৮ হাজার টাকা এবং তৃতীয় ধাপে ৩২ হাজার টাকা হবে।

২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হলে এই গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তা বা প্রধান শিক্ষকের শুরুতে মোট বেতন-ভাতা ৫০ হাজার টাকার বেশি হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদটি ১৩তম গ্রেডের, যেখানে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে শুরু হতো। নতুন কাঠামোয় তা ২৪ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হবে এবং সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে ২০২৮ সাল থেকে একজন নতুন সহকারী শিক্ষকের মোট বেতন-ভাতা ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি হবে।

নতুন চাকরিজীবীদের তুলনায় পুরোনোদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হিসাব ভিন্ন হবে। তাঁদের বর্তমান মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট এবং অন্যান্য সুবিধার ওপর মোট বেতন নির্ভর করবে। ঢাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক জানান, বর্তমানে তাঁর মূল বেতন ২২ হাজার ৪৫০ টাকা এবং বাড়িভাড়াসহ মোট বেতন প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। তিনি আনুমানিক হিসাব করে দেখেছেন, নতুন কাঠামোয় প্রথম ধাপে জুলাই থেকে তাঁর মোট বেতন ৪০ হাজার টাকা হতে পারে।

সব ধাপ ও ভাতা যোগ হয়ে পূর্ণাঙ্গ বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে ওই প্রধান শিক্ষকের মোট বেতন ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে হিসাবটি আরও স্পষ্ট হবে।

সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া পান, যেমন ঢাকায় ৫০ শতাংশ, অন্য বিভাগীয় শহরে ৪৫ শতাংশ এবং জেলা শহরে ৪০ শতাংশ। তবে গ্রেড ও এলাকাভেদে এতে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। সবার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, সন্তানের জন্য শিক্ষাসহায়ক ভাতা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং সরকারি দায়িত্ব ও যাতায়াতের জন্য টিএ বা ডিএসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা রয়েছে। এবার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ফোনের ভাতাও যুক্ত করা হয়েছে, যা বেতন গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও নতুন বেতনকাঠামোতে বিশেষ সুবিধা রয়েছে। মাসিক ৯,০০০ টাকার কম নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৯,০০১ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং ২০,০০০ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ পেনশন বাড়বে। ৩০,০০১ টাকা থেকে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং ৪০,০০১ টাকা বা তদূর্ধ্ব নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রেও পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সংবাদ সম্মেলনে বেতনকাঠামোর বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে, যা ন্যায্যতার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন বর্তমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। একইভাবে, বিংশতম গ্রেডে কর্মরত একজন ব্যক্তির মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...