প্রযুক্তি

টাঙ্গাইলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি বদল কার্যক্রমে নারীরা

টাঙ্গাইলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি বদল কার্যক্রমে নারীরা
টাঙ্গাইলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি বদল কার্যক্রমে নারীরা
টাঙ্গাইলে ক্যাসেটেক্সের ব্যাটারি নেটওয়ার্ক কার্যক্রমে নারীরা সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। সৌরচালিত ব্যাটারি অদলবদল ক্যাবিনেট পরিচালনার মাধ্যমে তাদের আয় বাড়ছে।

টাঙ্গাইল জেলায় বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য ব্যাটারি বদলানোর একটি নতুন কার্যক্রম চালু হয়েছে। এই আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নারীরা এখন সফলভাবে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। ক্যাসেটেক্স নামের একটি স্থানীয় স্টার্টআপ এই অঞ্চলে ব্যাটারি নেটওয়ার্ক কার্যক্রম শুরু করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সি (আইআরইএনএ) তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার এক সাধারণ নারী ঝর্ণা বেগমের তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, অনেক নারী জীবিকার সন্ধানে রাজধানী ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করতে গেলেও ঝর্ণা বেগম একটি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি চার বছর ধরে তার বাড়ির সামনে একটি মুদিদোকান চালাচ্ছিলেন।

পারিবারিক দায়িত্ব ও নানা কাজের চাপে ঝর্ণা বেগম তার দোকানের সময় কমাতে বাধ্য হন। দিনের অর্ধেক সময় দোকান বন্ধ থাকায় তার মাসিক আয় কমে গিয়েছিল। পরিবারের ভরণপোষণ এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে তিনি নতুন আয়ের উৎস খুঁজছিলেন।

ঠিক তখনই ক্যাসেটেক্সের ব্যাটারি নেটওয়ার্ক কার্যক্রম তার সামনে এক অভাবনীয় সুযোগ নিয়ে আসে। এই স্টার্টআপ নারীদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ চালিত ব্যাটারি অদলবদল ক্যাবিনেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর প্রস্তাব দেয়। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থাও এই ব্যবসায়িক মডেলের প্রশংসা করেছে।

এই মডেলটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার বাহন বা অটোরিকশার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় চলাচল করে। ঝর্ণা বেগম নিজেই জানান, তিনি প্রতিদিন তার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এই ধরনের বাহন ব্যবহার করেন।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা আরও জানিয়েছে, ব্যাটারি লিজিং ও সোয়াপিং পদ্ধতি গ্রাহকদের জন্য খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণের চিন্তা দূর করে। ক্যাবিনেটের মালিক হওয়ার সুযোগ পেয়ে ঝর্ণা আর দেরি করেননি। মাত্র দুই দিনের মধ্যে তিনি একজন মাইক্রো এনার্জি উদ্যোক্তা হিসেবে এই উদ্যোগে যোগ দেন।

প্রাথমিক বিনিয়োগের টাকা জোগাড় করা তার জন্য বেশ কঠিন ছিল। তবে পরিবারের সহযোগিতায় তিনি কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধ করেন। ক্যাসেটেক্স স্টার্টআপ এই ব্যাটারি সোয়াপিং ক্যাবিনেটগুলো তৈরি করেছে এবং এই অবদানের জন্য আইরেনা রাইজিং স্টার পুরস্কার লাভ করেছে।

এই সৌরশক্তিচালিত ক্যাবিনেট থেকে অটোরিকশার চালকেরা সহজেই তাদের পুরোনো ব্যাটারি বদলে নতুন ব্যাটারি নিতে পারেন। চালকদের জন্য ক্যাবিনেট ব্যবহার করার প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। তারা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ক্যাবিনেটের মালিকদের অর্থ পরিশোধ করেন।

ক্যাবিনেটের মালিকদের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অটোরিকশার চালকেরা যখন ব্যাটারি বদলান, তখন মালিকেরা তাদের প্রতিদিনের আয় দেখতে পান। এই কাজের জন্য বেশি সময় দিতে হয় না, যা ঝর্ণার মতো ব্যস্ত নারীদের জন্য সুবিধাজনক।

ঝর্ণা বেগম জানান, তার স্বল্প পড়াশোনা নিয়ে অ্যাপের হিসাব নিয়ে প্রথমে কিছুটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু ক্যাবিনেটটি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় তার কোনো ঝামেলা হয় না। দোকানের সামনে ক্যাবিনেট বসিয়ে রাখলেই কাজ হয়ে যায়, গ্রাহকদের জন্য আলাদাভাবে অপেক্ষা করতে হয় না।

মোবাইল অ্যাপের হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিদিনের আয়ের টাকা সরাসরি তার মোবাইল ওয়ালেটে চলে আসে। যেকোনো সময় তিনি সেই টাকা তুলে নিতে পারেন। এটি তার আর্থিক লেনদেনকে সহজ ও নিরাপদ করেছে।

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট সাধারণ চার্জিং পদ্ধতিকে প্রায়শই ব্যাহত করে। কিন্তু সৌরচালিত ক্যাবিনেট থাকায় গ্রাহকদের সেই সমস্যা পোহাতে হয় না। ক্যাবিনেটের ভেতরে ব্যাটারি অবিরাম সৌরশক্তিতে চার্জ হতে থাকে, যা নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করে।

চালকেরা এই সেবায় সন্তুষ্ট হওয়ায় ঝর্ণা বেগমের ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটে। সারা দিন দোকান খোলা রাখার পাশাপাশি ক্যাবিনেট থেকে তার বাড়তি আয় যুক্ত হয়। ঝর্ণা বেগমের মাসিক আয় ২৫ ডলার (প্রায় ৩ হাজার ১০০ টাকা) থেকে বেড়ে ১২২ ডলার (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) ছাড়িয়ে গেছে।

অনেক অটোরিকশার চালক এখন তার কাছ থেকে সেবা নিতে আগ্রহী। ঝর্ণা বেগম বর্তমানে আরেকটি ক্যাবিনেট বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এই কাজের মাধ্যমে তিনি আর্থিক ও সামাজিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছেন।

তিনি অন্যান্য নারীদেরও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন। ইলেকট্রিক অটোরিকশা কম খরচে যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...