প্রযুক্তিটর প্রজেক্টের জন্ম ও বিকাশ
টর প্রজেক্টের জন্ম ও বিকাশ
অনলাইন গোপনীয়তা রক্ষায় সামরিক গবেষক ও হ্যাকারদের জোট থেকে টর প্রজেক্টের জন্ম হয়। এটি মার্কিন সরকারের অনুদানে বিকশিত একটি বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক, যা ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন রাখে।
প্রযুক্তির জগতে অনলাইন গোপনীয়তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। ইন্টারনেট উন্মুক্ত তথ্য বিনিময়ের বার্তা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, সেখানে নজরদারির সম্ভাবনা বিদ্যমান। সামরিক গবেষক ও হ্যাকারদের একটি বিশেষ জোটের মাধ্যমে টর (দ্য অনিয়ন রাউটিং) প্রজেক্টের জন্ম হয়। এই প্রকল্পটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানুষের ডিজিটাল স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে চলেছে।
টর সাধারণত ডার্ক ওয়েব বা ডার্ক নেট নামে পরিচিত। এটি মার্কিন সরকারের অনুদানে তৈরি হয়েছে, যদিও এটি অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত। টর একটি বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল অবকাঠামো, যা ব্যবহারকারীদের অনলাইন পরিচয় গোপন রাখে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সার্ভারের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কটি কাজ করে।
টর প্রজেক্টের ওয়েবসাইট থেকে এই ব্রাউজার বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায়। ব্রাউজারটি ব্যবহারের সময় ইন্টারনেট সিগন্যাল এনক্রিপ্ট হয়ে একাধিক সার্ভারের মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়। এর ফলে বিভিন্ন সরকারের পক্ষে ব্যবহারকারীদের অনলাইন কার্যক্রম ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আজকের ডিজিটাল সমাজে ভিপিএন এবং এনক্রিপ্টেড মেসেঞ্জার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষার জন্য এই প্রযুক্তিগুলো অপরিহার্য। তবে রাষ্ট্রীয় নজরদারি এড়ানোর উপায় থাকায় এই প্রযুক্তিগুলো নিয়ে সংঘাতও দেখা যায়। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট রোধে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করছে।
বিকৃত বা উগ্র কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক নীতির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, করপোরেট লোভ এবং উগ্র মানসিকতাও দায়ী। টর নেটওয়ার্কের পেছনের ইতিহাস গত ৩০ বছরে নানা ধরনের তথ্য প্রকাশ করে। নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের শুরুর সময়টি ছিল সম্ভাবনাময় এবং একই সাথে সংঘাতপূর্ণ।
সেই সময় সাইফারপাঙ্ক নামে পরিচিত হ্যাকার ও কম্পিউটারবিজ্ঞানীরা সামরিক এনক্রিপশন পদ্ধতি উন্মুক্ত করেন। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ইন্টারনেট স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করতে পারে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে এনক্রিপশন ইন্টারনেটের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। ইন্টারনেটের মূল স্থপতিরা এনক্রিপশনকে সিস্টেম সচল রাখতে জরুরি মনে করতেন।
তবে নিজেদের বৈশ্বিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গোপনীয়তা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়। মার্কিন সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে তখন ইন্টারনেট নিয়ে একচেটিয়া ধারণা কাজ করছিল। সীমানাহীন বাজারে অবাধ তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ধারণা বিজয়ী হবে বলে বিশ্বাস করা হতো। স্নায়ুযুদ্ধের অবসরের পর মার্কিন সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের পারদ ছিল শীর্ষে।
এই বিশৃঙ্খল ও উচ্চ ঝুঁকির পরিবেশেই ডার্ক ওয়েবের প্রযুক্তির জন্ম হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি থেকে টরের যাত্রা শুরু হয়। টরের মূল ভিত্তি তৈরি হয় একটি সাধারণ কম্পিউটার ল্যাবে। ডেভিড গোল্ডশ্লাগ, মাইক রিড এবং পল সাইভারসন নামের তিনজন গবেষক এই কাজ শুরু করেন।
বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের উত্থান সামরিক ব্যবহারকারীদের জন্য নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বার্তা সুরক্ষিত রাখতে এনক্রিপশন প্রযুক্তি আগেই তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কনটেন্টের বাইরে নেটওয়ার্কের নিজস্ব নিরাপত্তা সমস্যা রয়ে গিয়েছিল। ইন্টারনেটের ট্রাফিক রাউটিং সিস্টেমে মেটাডেটা ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা ছিল।
চিঠির খামের ওপর প্রাপক ও প্রেরকের ঠিকানা লেখার মতো মেটাডেটা কাজ করে। এই মেটাডেটা ইন্টারনেটের ডিজাইনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের পক্ষে এই তথ্য দেখা স্বাভাবিক বিষয়। রাউটিং ডিজাইন মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
এর ফলে রাষ্ট্র মূল পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহারকারীর ট্রাফিক নজরদারি করতে পারত। কিন্তু সিআইএ বা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা বিদেশি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে আইএসপি তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সামরিক গবেষকেরা নতুন উপায় খুঁজতে শুরু করেন। গবেষকেরা এমন একটি পথ খুঁজছিলেন, যা সামরিক বাহিনীকে গতির সুবিধা দেবে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্কের মেটাডেটা ঝুঁকি থেকে তাঁদের রক্ষা করবে।
এখান থেকেই অনিয়ন রাউটিং ধারণার জন্ম হয়। অনিয়ন রাউটিংয়ের মূলনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও এর মৌলিক বিষয় একই রয়েছে। ইন্টারনেটের রাউটিং তথ্য তিনটি স্তরের এনক্রিপশনে লুকিয়ে রাখা হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন রাউটার বা রিলে সার্ভারের মাধ্যমে ট্রাফিক বাউন্স করানো হয়।
প্রতিটি রিলে একটি করে এনক্রিপশন স্তর খুলে পরবর্তী সার্ভারের ঠিকানা প্রকাশ করে। শেষ সার্ভারটি গন্তব্য নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট ওয়েব সার্ভিসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এর ফলে কোনো সার্ভারের পক্ষেই উৎস ও গন্তব্য একসঙ্গে দেখা সম্ভব হয় না। গোপনীয়তা রক্ষা করতে হলে টর নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করা অপরিহার্য ছিল।
এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই সাইফারপাঙ্ক এবং মার্কিন নৌবাহিনীর মধ্যে এক অদ্ভুত জোট গড়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচারের জন্য গবেষকেরা হ্যাকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নৌবাহিনীর গবেষকেরা ১৯৯৭ সালে ওকল্যান্ডে এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।
মতামত (0)