আয়াতুল কুরসির পরিচিতি
নিচে একটি সারণির মাধ্যমে আয়াতুল কুরসির প্রাথমিক তথ্য দেওয়া হলো:
আয়াতুল কুরসি: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
যেকোনো দোয়া বা কোরআনের আয়াত পড়ার সময় তার সঠিক উচ্চারণ ও অর্থ বোঝা অত্যন্ত জরুরি। নিচে আয়াতুল কুরসি বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:
আয়াতুল কুরসি আরবি (Arabic Text)
اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيْطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
আয়াতুল কুরসি বাংলা উচ্চারণ (Bangla Pronunciation)
আয়াতুল কুরসি বাংলা অর্থ (Bangla Meaning)
আয়াতুল কুরসির শাব্দিক বিশ্লেষণ ও গভীর মর্মার্থ
আয়াতুল কুরসির গভীরতা বুঝতে হলে এর প্রতিটি বাক্যের অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা প্রয়োজন। আল্লামা ইবনে কাসির (র.) এর মতে, এই আয়াতে ১০টি পূর্ণাঙ্গ বাক্য রয়েছে, যার প্রতিটি আল্লাহর এক একটি মহান গুণকে প্রকাশ করে।
- ১. আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া (اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ)
- এটি তাওহীদের মূল মন্ত্র। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। তিনি একক, অদ্বিতীয় এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
- ২. আল-হাইয়্যুল কাইয়্যুম (الْحَيُّ الْقَيُّومُ)
- ‘হাইয়্যু’ শব্দের অর্থ হলো চিরঞ্জীব। অর্থাৎ যাঁর কোনো শুরু নেই এবং যাঁর কোনো শেষ নেই। আর ‘কাইয়্যুম’ শব্দের অর্থ হলো সবকিছুর ধারক ও নিয়ন্ত্রক। তিনি নিজে প্রতিষ্ঠিত এবং পুরো মহাবিশ্বকে তিনিই টিকিয়ে রেখেছেন।
- ৩. লা তা’খুযুহু সিনাতুঁও ওয়ালা নাউম (لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ)
- মানুষ বা সৃষ্টিজীব ক্লান্ত হলে তন্দ্রা বা নিদ্রায় যায়। কিন্তু বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা এসব মানবিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। ‘সিনা’ মানে হলো তন্দ্রা বা হালকা ঝিমুনি, আর ‘নাউম’ মানে গভীর ঘুম। মহাবিশ্ব পরিচালনায় তিনি কখনো অসতর্ক হন না।
- ৪. লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্ব (لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ)
- সাত আকাশ এবং এই বিশাল পৃথিবীর মালিকানা একমাত্র তাঁরই। আমরা যা কিছু দেখি বা দেখি না, সবকিছুর প্রকৃত স্বত্বাধিকারী আল্লাহ।
- ৫. মান যাল্লাযি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইযনিহ (مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ)
- পরকালে বা ইহকালে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো সুপারিশ করার ক্ষমতা নেই। মুশরিকরা ভাবত তাদের দেব-দেবীরা সুপারিশ করে তাদের রক্ষা করবে, এই বাক্যটি সেই ভ্রান্ত ধারণাকে নাকচ করে দেয়।
- ৬. ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম (يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ)
- তিনি সৃষ্টিজীবের বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক অবগত। কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নেই।
- ৭. ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ (وَلَا يُحِيْطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ)
- মানুষ বা জ্বীন নিজের চেষ্টায় আল্লাহর কোনো জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। আল্লাহ কেবল তাকেই জ্ঞান দান করেন, যাকে তিনি ইচ্ছা করেন। বিজ্ঞানের সব আবিষ্কারও আল্লাহর ইচ্ছাধীন জ্ঞানেরই অংশ।
- ৮. ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব (وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ)
- এখানে ‘কুরসি’ শব্দের অর্থ নিয়ে ব্যাখ্যাকারদের ভিন্ন মত আছে। কেউ বলেছেন এটি আল্লাহর জ্ঞান, কেউ বলেছেন এটি আল্লাহর ক্ষমতা বা তাঁর মহান আরশের নিচের একটি অংশ। এর বিশালতা এতই বেশি যে তা আসমান ও জমিনকে বেষ্টন করে আছে।
- ৯. ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা (وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا)
- আকাশ ও পৃথিবীর মতো বিশাল সৃষ্টিকে রক্ষা করা এবং তাদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা মহান আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন বা ক্লান্তিকর নয়।
- ১০. ওয়া হুয়াল আলিয়্যুল আজিম (وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ)
- পরিশেষে বলা হয়েছে, তিনি সুউচ্চ ও সুমহান। অর্থাৎ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সমকক্ষ কেউ নেই।
আয়াতুল কুরসির অসামান্য ফজিলত
হাদিস শরিফে আয়াতুল কুরসির অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। কেন এই আয়াতটি এত গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে নিচের হাদিসগুলো সহায়ক হবে:
- ১. জান্নাতে প্রবেশের চাবিকাঠি
- ২. শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্তি
- ৩. কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত
- ৪. অভাব মোচন ও বরকত বৃদ্ধি
আয়াতুল কুরসি পাঠের উপযুক্ত সময়
| সময় | ফজিলত ও উপকারিতা |
|---|---|
| প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর | জান্নাতে যাওয়ার সহজ পথ ও নিরাপত্তা। |
| রাতে ঘুমানোর আগে | সারারাত ফেরেশতাদের পাহারায় থাকা এবং শয়তান থেকে রক্ষা। |
| সকাল ও সন্ধ্যায় | সারাদিন ও সারারাত জ্বিন ও অশুভ শক্তি থেকে নিরাপত্তা। |
| ঘর থেকে বের হওয়ার সময় | ৭০ হাজার ফেরেশতা তাকে চারপাশে পাহারা দেয়। |
| কোনো বিপদে পড়লে | মানসিক প্রশান্তি এবং আল্লাহর সাহায্য লাভ। |
আয়াতুল কুরসির অলৌকিক গঠনশৈলী
আয়াতুল কুরসির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষাগত গঠন। আলেমগণ লক্ষ্য করেছেন যে, এই আয়াতের ৯টি বাক্য বা অংশ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে প্রথম অংশের সাথে শেষ অংশের একটি চমৎকার মিল রয়েছে।
আয়াতুল কুরসি বাংলা উচ্চারণ ও ...
১. প্রথম বাক্য: ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম’ (আল্লাহর সত্তা)।
২. দ্বিতীয় বাক্য: ‘লা তা’খুযুহু সিনাতুঁও ওয়ালা নাউম’ (তন্দ্রা বা নিদ্রা নেই)।
৩. তৃতীয় বাক্য: ‘লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্ব’ (আকাশ ও পৃথিবীর সব তাঁর)।
৪. চতুর্থ বাক্য: ‘মান যাল্লাযি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইজনিহ’ (অনুমতি ছাড়া সুপারিশ অসম্ভব)।
৫. পঞ্চম বা কেন্দ্রীয় বাক্য: ‘ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম’
(তিনি তাদের সামনে ও পেছনের সব জানেন)। এই বাক্যটি আয়াতের একেবারে কেন্দ্রে
অবস্থিত, যা আল্লাহর সর্বব্যাপক জ্ঞানকে নির্দেশ করে।
৬. ষষ্ঠ বাক্য: ‘ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ’ (তাঁর ইচ্ছার বাইরে জ্ঞান অর্জন অসম্ভব)। (উভয় অংশেই আল্লাহর অনুমতি বা ইচ্ছার ওপর নির্ভরতা প্রকাশ পেয়েছে)
৭. সপ্তম বাক্য: ‘ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব’ (তাঁর কুরসি আকাশ ও পৃথিবী জুড়ে)। (উভয় অংশেই আকাশ ও পৃথিবীর মালিকানা ও ব্যাপ্তির কথা আছে)
৮. অষ্টম বাক্য: ‘ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা’ (রক্ষণাবেক্ষণে তিনি ক্লান্ত হন না)। (উভয় অংশেই আল্লাহর ক্লান্তিহীনতার কথা আছে)
৯. নবম বাক্য: ‘ওয়া হুয়াল আলিয়্যুল আজিম’ (আল্লাহর মহিমা)। (১ এবং ৯ উভয় অংশেই আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণিত)
এই ধরণের অলৌকিক সাহিত্যিক গঠন কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, যা প্রমাণ করে যে কোরআন মহান আল্লাহর বাণী।



মতামত (1)