ধর্ম

নবীজির দৈনন্দিন ছয় স্বাস্থ্যকর অভ্যাস: সুস্থ জীবনধারার নির্দেশনা

নবীজির দৈনন্দিন ছয় স্বাস্থ্যকর অভ্যাস: সুস্থ জীবনধারার নির্দেশনা
নবীজির দৈনন্দিন ছয় স্বাস্থ্যকর অভ্যাস: সুস্থ জীবনধারার নির্দেশনা
ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাত্যহিক জীবনের ছয়টি অভ্যাস সুস্থ দেহ ও মন বজায় রাখার জন্য বিজ্ঞানসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এসব অভ্যাসের মধ্যে রয়েছে খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা, পেটের এক-তৃতীয়াংশ নীতি মেনে খাবার গ্রহণ, বসে ধীরে ধীরে পানি পান, নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার এবং দুপুরে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম

ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এক সুষম ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, যা মানবদেহের সুস্থতা নিশ্চিত করে। তিনি স্বাস্থ্যকে ঈমানের পর মানুষের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, "তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সুস্বাস্থ্য প্রার্থনা করো। কেননা, ঈমানের পর সুস্বাস্থ্যের চেয়ে উত্তম কোনো বস্তু কাউকে দেওয়া হয়নি।"

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে ছয়টি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর রাতের রুটিন ছিল দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া এবং শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ ও ফজরের জন্য জেগে ওঠা। তিনি ইশার নামাজের পর অপ্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা পছন্দ করতেন না।

প্রথম অভ্যাসটি হলো খুব সকালে জেগে ওঠা। রাসুল (সা.) উম্মতের জন্য ভোরের কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেছিলেন, "হে আল্লাহ, আমার উম্মতের সকালের প্রহরে বরকত দান করুন।" আধুনিক ঘুম ও নিউরোবায়োলজি অনুযায়ী, মানবদেহে একটি নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ রয়েছে। ভোরের নির্মল বাতাসে ওজোন ও বিশুদ্ধ অক্সিজেনের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, যা ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে। দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার ফলে দেহে কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও মানসিক বিষণ্নতা তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয় অভ্যাসটি হলো পেটের এক-তৃতীয়াংশ নীতি অনুসরণ করা। অতিভোজন ও অপরিমিত খাদ্য গ্রহণ আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ জটিল রোগের মূল কারণ। মহানবী (সা.) খাদ্য গ্রহণের এক বৈপ্লবিক ফর্মুলা দিয়েছিলেন, যা বর্তমান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, "পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ কখনো ভর্তি করেনি। মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা আহারই যথেষ্ট। যদি খেতেই হয়, তবে সে যেন পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ফাঁকা রাখে।" পেট পুরোপুরি ভর্তি না করে এক ভাগ খালি রাখলে খাদ্য পরিপাক দ্রুত ও সহজ হয়, অম্লতা প্রতিরোধ হয় এবং পরিপাকতন্ত্রে অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। তিনি কখনো আহারে কোনো ত্রুটি ধরতেন না; পছন্দ হলে তৃপ্তি ভরে খেতেন, আর রুচি না হলে শান্তভাবে তা এড়িয়ে যেতেন।

তৃতীয় অভ্যাস হলো ধীরে-সুস্থে ও বসে তিন শ্বাসে পানি পান করা। তৃষ্ণার্ত হয়ে দাঁড়িয়ে দ্রুত পানি পান করা আধুনিক গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স ও খাদ্যনালির বিভিন্ন সমস্যার কারণ। মহানবী (সা.) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। রাসুল (সা.) সর্বদা বসে, পাত্রের বাইরে নিশ্বাস ছেড়ে, ধীরে ধীরে তিন শ্বাসে পানি পান করতেন। দাঁড়িয়ে দ্রুত পানি পান করলে পানির তীব্র স্রোত খাদ্যনালি দিয়ে সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে আঘাত হানে, যা সময়ের ব্যবধানে পরিপাকতন্ত্রের সংবেদনশীল আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বসে ধীরে ধীরে পানি পান করলে স্নায়ুতন্ত্র শিথিল থাকে এবং কিডনি রক্ত থেকে বিষাক্ত উপাদান ফিল্টার করার পর্যাপ্ত সময় পায়।

চতুর্থ অভ্যাসটি হলো দাঁতের যত্নে মিসওয়াক ব্যবহার। দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় মহানবী (সা.) ছিলেন সচেতন পথপ্রদর্শক। তিনি প্রতিটি অজুর সময়, নামাজে দাঁড়ানোর আগে, ঘুম থেকে ওঠার পর এবং ঘরে প্রবেশ করার মুহূর্তে নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করতেন। তিনি বলেছেন, "মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কারকারী এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।" অন্য বর্ণনায় এসেছে, "যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রতি ওয়াক্তের নামাজের আগেই তাদের মিসওয়াক করা বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতাম।" প্রাকৃতিক জয়তুন বা পিলুগাছের ডালে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান, যা মাড়ির প্রদাহ ও দাঁতের ক্ষয়রোধে কৃত্রিম টুথব্রাশের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। মুখের ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা নবীজি (সা.) শতাব্দী আগেই প্রতিরোধ করেছিলেন।

পঞ্চম অভ্যাসটি হলো দুপুরে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম নেওয়া। দুপুরের খাবারের পর কিংবা জোহরের পর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সামান্য গা এলিয়ে দেওয়া ছিল নবীজি (সা.)-এর নিয়মিত অভ্যাস, যাকে আরবিতে ‘কায়লুলাহ’ বলা হয়। তিনি বলেছেন, "তোমরা কায়লুলাহ গ্রহণ করো। কেননা, শয়তান কখনো কায়লুলাহ করে না।"

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...