আন্তর্জাতিক

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা হলে মার্কিন বাহিনীকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। রোববার দেশটির পার্লামেন্ট তার এই নিয়োগ অনুমোদন করে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আখলাঘি বলেছেন, ইরান তার প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং দেশটির ওপর হামলা হলে মার্কিন বাহিনীকে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলা চালানোর সাহস করার কথা নয়। তবে হামলা হলে এর পরিণতি যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলকেই ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, মানুষ নিশ্চিন্ত থাকতে পারে, সম্ভবত তারা আমাদের ওপর হামলা চালানোর সাহস করবে না। যদি তারা হামলা চালায়, তাহলে তাদের নিজেদের এবং পুরো অঞ্চলকে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এখন চিন্তা করতে বলেছেন, কীভাবে তিনি এই অঞ্চল থেকে তাঁর বাহিনীকে বহাল তবিয়তে ফিরিয়ে নেবেন। আখলাঘি আরও বলেন, যদি এখানে একটি বোমাও ফেলা হয়, তবে তাঁর কতজন সেনাকে কফিনে করে ফেরত নিতে হবে, তা তিনি নিজেই দেখতে পাবেন। যুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধ–পরবর্তী সামরিক প্রয়োজন ভালোভাবে বোঝার জন্য তিনি আইআরজিসির প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠক করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মেহরদাদ আখলাঘিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে দেশটির পার্লামেন্টের অধিবেশন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওই হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।

এরপর থেকে মজিদ ইবনে রেজা ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। নতুন মন্ত্রী নিয়োগের পর তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ৬৮ বছর বয়সী আখলাঘির নিয়োগের পক্ষে পার্লামেন্টে ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা ভোট দিয়েছেন। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন মাত্র ১৫ জন, মোট ২৭৭টি ভোটের মধ্যে তিনি ২৩৭টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি সামরিক প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞ। তার মূল দক্ষতার ক্ষেত্র হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ ও উড়োজাহাজ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন। এর আগে তিনি শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০১৩ সাল থেকে তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইরানিয়ান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। ইরানের সামরিক শিল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং ২০০৭ সালে জাতিসংঘ আখলাঘির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

গত কয়েক দশকে ইরানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ‘সেজিল’ ও ‘জুলফিকার’ সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ‘আলমাস’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ইয়াসিন’ নামের নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম গাইডেড বোমা। সেমনান প্রদেশের ইমাম খোমেনি স্পেস সেন্টারের অবকাঠামো উন্নয়নেও তার ভূমিকা ছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে তার ৪২ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে আখলাঘির ৪২ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পরিকল্পনাগুলো দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষ, প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির অনুমোদন পেয়েছে। পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আগে থেকে কারও ওপর আক্রমণ করবে না।

তবে প্রেসিডেন্ট আরও উল্লেখ করেন, দেশটির ওপর হামলা হলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তেহরান শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। চলতি মাসের শুরুতে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই নিক জানিয়েছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন থেকেই আখলাঘিকে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের সামরিক শিল্প পুনর্গঠন করা নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানো এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নও তার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জও তাকে সামলাতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে, তারা ইরানের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তেহরানের বক্তব্য ভিন্ন। তারা জানায়, বোমা হামলার নাগালের বাইরে থাকা বিভিন্ন স্থাপনায় তাদের পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা হচ্ছে।

পার্লামেন্টে ভোটাভুটির আগে আখলাঘি বলেছিলেন, পার্লামেন্ট তার ওপর আস্থা রেখে ভোট দিলে দেশের এক সংবেদনশীল সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তার ওপর বর্তাবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশকে রক্ষা করতে হলে সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকতে হবে। বিভিন্ন ঘটনার পেছনের যুক্তি বুঝতে হবে, প্রভাব বিস্তারকারী প্রবণতাগুলো শনাক্ত করতে হবে এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...