ধর্ম

ইসলামি শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য ও আধুনিক প্রেক্ষাপট

ইসলামি শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য ও আধুনিক প্রেক্ষাপট
ইসলামি শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য ও আধুনিক প্রেক্ষাপট
ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ বা শরিয়তের উদ্দেশ্য, যা ধর্ম ও মানবসত্তার সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ধ্রুপদী পাঁচটি উদ্দেশ্য ছাড়াও আধুনিক যুগে নতুন কিছু বিষয় এর পরিধিতে যুক্ত হচ্ছে।

আইনশাস্ত্রের পরিভাষায় কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিকে ‘উপরি-সাংবিধানিক মূলনীতি’ বলা হয়, যা পুরো আইন কাঠামোর মূল স্পন্দন হিসেবে কাজ করে। ইসলামে উসুল ও উদ্দেশ্যভিত্তিক দর্শন বা ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধর্ম এবং মানবসত্তা এই দুটি মূল ভিত্তি বা উপরি-সাংবিধানিক মূলনীতি হিসেবে কাজ করে। ইসলামি জীবনবিধানে ধর্ম ও মানুষ এই দুটি উপাদান কখনোই একটি অপরটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

একদিকে ধর্মের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় কিছু মৌলিক সত্য রয়েছে, যেমন ইমানের মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদতের নির্ধারিত ফরজসমূহ। অন্যদিকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল মানুষের সমাজ, পরিবেশ, মেধা ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিদ্যমান। মানবজীবন স্থবির নয়, বরং তা নিরন্তর গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। সময়ের আবর্তে মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো আরও জটিল হয়।

একটি গতিশীল মানবসমাজকে পরিচালনা করতে হলে শরিয়তের মৌলিক বিধানের আলোকেই যুগের প্রয়োজনকে অনুধাবন করতে হয়। শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদ’ অনুধাবনের ক্ষেত্রে ধর্ম ও মানবসত্তার এই যুগলবন্দি কীভাবে কাজ করে, তা পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবর্তিত বাস্তবতায় ফিকহের নমনীয়তা কতটা সুদূরপ্রসারী, তা অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ।

ধ্রুপদী ফিকহশাস্ত্রে আলেমগণ শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যকে প্রধানত পাঁচটি অপরিহার্য শাখায় বিভক্ত করেছেন, যাকে মাকাসিদে শরিয়াহ বলা হয়। এগুলো হলো ধর্ম সংরক্ষণ (হিফজুদ্দীন), জীবন বা আত্মরক্ষা (হিফজুন নফস), বুদ্ধি বা মেধা সংরক্ষণ (হিফজুল আকল), বংশধারা বা পরিবার সংরক্ষণ (হিফজুন নাসল) এবং সম্পদ সংরক্ষণ (হিফজুল মাল)। ঐতিহ্যগতভাবে এই পাঁচটি খাতকে আলাদা করে আলোচনা করার একটি প্রবণতা ছিল।

তবে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, এই পাঁচটি উদ্দেশ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইসলামি জীবনদর্শনের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণেই এই লক্ষ্যগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রূপান্তর দেখা যায়। ধর্মীয় চেতনা রক্ষা করার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো মানুষের জীবন ও আত্মাকে রক্ষা করা, কারণ জীবিত ও সুস্থ মানুষই শরিয়তের বিধান বাস্তবায়ন করবে।

ঠিক তেমনি, মানুষের সম্পদ ও বংশধারা রক্ষা করা মূলত তার মানবিক অস্তিত্ব ও সামাজিক শান্তি রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামে সম্পদের নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বরং তা জীবন ও ধর্ম রক্ষার মাধ্যম। নিজের সৎ উপায়ে অর্জিত সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যদি কেউ নিহত হয়, তবে তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ।” ইমাম শাতিবি এ বিষয়ে লিখেছেন, “শরিয়তের সমস্ত আইন ও বিধিনিষেধ মূলত এই পঞ্চ-উদ্দেশ্য রক্ষার জন্যই বিন্যস্ত হয়েছে, যাতে মানুষের ইহজাগতিক কল্যাণ এবং পরজাগতিক মুক্তি উভয়ই নিশ্চিত হয়।” শরিয়তের প্রতিটি ক্ষুদ্র বা বৃহৎ নির্দেশ একই সঙ্গে মানবসত্তা এবং ধর্মের হেফাজত নিশ্চিত করে।

আধুনিক ফিকহবিদগণ বলছেন যে যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাকাসিদের পরিধি শুধু এই ঐতিহ্যবাহী পাঁচটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। আজকের বিশ্বে সভ্যতার বিবর্তন, রাষ্ট্রব্যবস্থার জটিলতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনে বহু নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। এসব বিষয় রক্ষা করা শরিয়তের মূল স্পন্দনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদগণ প্রাচীন পঞ্চ-মাকাসিদের পাশাপাশি আরও কিছু সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক উদ্দেশ্যকে স্বাধীন মাকাসিদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার সংরক্ষণ (হুকুকুল ইনসান), মানবিক স্বাধীনতা (আল-হুররিয়্যাহ), ইনসাফ বা সামাজিক বিচারপরায়ণতা, পরিবেশ সুরক্ষা (হিফজুল বিআহ) এবং রাষ্ট্র বা জাতীয় সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ (হিফজুল ওয়াতান)। ‘রাষ্ট্র বা মাতৃভূমি সংরক্ষণ’কে একটি স্বাধীন উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করার কারণ হলো, আজকের বিশ্ব বাস্তবতায় কোনো জাতি তার রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হারালে সেখানে মানুষের জীবন, ধর্ম, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...