ধর্ম

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজের নীরবতা ভাঙবে কবে?

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজের নীরবতা ভাঙবে কবে?
মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজের নীরবতা ভাঙবে কবে?
মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে | প্রথম আলো মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে সামাজিক মাধ্যমের টুকরা টুকরা আলাপের গণ্ডি পেরিয়ে এখন মূলধারার গণমাধ্যমেও উঠে আসছে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর নিপীড়নের ভয়াবহ কাহিনি। এ ধরনের ঘটনায় আলেমসমাজের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর ভয়ংকর নিপীড়নের সব কাহিনি মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে আসছে, তখন আলেমসমাজের নীরবতা এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। গেঞ্জি পরা এক শিক্ষকের মোটা লাঠি দিয়ে ৮-৯ বছরের এক শিশুকে বেধড়ক পেটানো, এরপর লাথি মেরে মুখে-পেটে উপর্যুপরি ঘুষি চালানোর যে বর্বর দৃশ্য সম্প্রতি অসংখ্য মানুষ দেখেছেন, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক বিস্তৃত সমস্যার ভয়াবহ চিত্র। পাশের সারিগুলোতে বসে থাকা অন্যান্য শিশুদের আতঙ্কিত মুখ স্পষ্ট করে তোলে এমন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি।

এই ধরনের দৃশ্য অবশ্য অনেকের কাছেই নতুন নয়, বরং এক বেদনাদায়ক স্মৃতির প্রতিচ্ছবি। গৌরনদী মাদ্রাসা-মসজিদের দোতলায় মুফতি হুজুরের হাতের বাঁশের মোটা লাঠি দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ছোট ছোট শিশুদের কাতরাতে দেখা এবং তাদের তীব্র চিৎকার শোনার অভিজ্ঞতা এখনো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। ছাত্রদের সামান্য অপরাধ, যেমন ফুটবল বিশ্বকাপের সময় টেলিভিশনে খেলা দেখতে যাওয়া, এমন নিষ্ঠুর শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াত, যেখানে রান্নাঘরের তরকারি নাড়ানোর বিশাল হাতা হয়ে উঠত নির্যাতনের হাতিয়ার।

হুজুরের ছুড়ে মারা বেতের আগা কীভাবে নেয়ামতের ঊরুতে গেঁথে গিয়ে রক্তে পায়জামা ভিজিয়ে দিয়েছিল, সেই ঘটনা আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে। হলরুমের মতো বিশাল হেফজখানার এক মাথা থেকে লাথি মেরে শিশুটিকে অন্য মাথায় গড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য কিংবা হাত-পায়ের সঙ্গে শিকল দিয়ে ভারী গাছের টুকরা বেঁধে রাখার ঘটনাও ঘটেছিল, কেবল মাদ্রাসা থেকে পালাতে না পারার জন্য। এতে শিক্ষকেরা খুব দুঃখিত হতেন না, বরং ছাত্রদের দেওয়া শাস্তি নিয়ে নানান মুখরোচক টিপ্পনী কাটতেন, যেমনটি সম্প্রতি টিকটকে এক শিক্ষক বাচ্চার মুখে বেত দিয়ে খোঁচা মেরে ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, "বাচ্চাদের কান্না করাতে ভালোই লাগে"।

অভিভাবকেরাও এক্ষেত্রে এক কাঠি সরেস ছিলেন; সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে তারা নির্দ্বিধায় বলে আসতেন, "হুজুর, গোশত আপনার, আর হাড্ডি আমার", যা প্রকারান্তরে শিক্ষকদের হাতে শিশুদের উপর অকথ্য নির্যাতনের এক অলিখিত অনুমতিপত্র হয়ে দাঁড়াতো। তবে শুধু শারীরিক শাস্তি দেওয়াই মাদ্রাসাশিক্ষকদের একমাত্র অপরাধ নয়, সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা পেরিয়ে এখন মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে আসছে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের আরও ভয়াবহ সব কাহিনি। আমাদের সময়েও শিক্ষক কর্তৃক নিপীড়নের ঘটনা শোনেনি, এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল বলে ধারণা করা হয়।

বর্তমানে মহিলা মাদ্রাসায় ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাও প্রকাশ্যে আসছে, এমনকি ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড কিংবা আত্মহত্যার অভিযোগও উঠছে। গত ১৯ মে দেশব্যাপী রামিসা হত্যাকাণ্ডের আলোচনার দিনে বনশ্রীর একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের শিশু আবদুল্লাহর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়, যার পায়ুপথে ছিল যৌন নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত। কুমিল্লার একটি মহিলা মাদ্রাসায় একের পর এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাও ময়নাতদন্তে নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

এছাড়াও, সামাজিক মাধ্যমে পাঠরত শিশুর ছবি বা ভিডিও রেকর্ড করে আপত্তিকর ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যসহ পোস্ট করছেন খোদ শিক্ষকেরা, যা এক নতুন ধরনের অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে দেখলে, মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নিপীড়নের ঘটনায় শারীরিক শাস্তি, ছেলেশিশুকে ধর্ষণ, মেয়েশিশুকে ধর্ষণ, নিপীড়নের পর হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার পরিবেশ তৈরি, শিশু নিপীড়নের দৃশ্য রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা এবং শিশুর ছবি/ভিডিও নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যসহ ছড়িয়ে দেওয়া—এগুলোসহ অনেকগুলো অপরাধের বিন্যাস ঘটেছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, এর প্রতিটিই গুরুতর অপরাধ এবং এর শাস্তি সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে এর প্রয়োগের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, যা ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ। টাঙ্গাইল সদরের একটি মাদ্রাসায় ৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর যৌন হেনস্তার ঘটনা এর একটি চরম দৃষ্টান্ত। অভিভাবকের অভিযোগ ছিল, মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শিশুদের জিনের ভয় দেখিয়ে শরীরের সংবেদনশীল স্থানে স্পর্শ করতেন এবং তা মুঠোফোনে ধারণের নির্দেশ দিতেন। অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হলেও মাত্র দুই মাস পর জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন নামে আরেকটি মাদ্রাসা খুলে বসেন, তাও আবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে, যা বিচারহীনতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

এই ধরনের ঘটনা কীভাবে সম্ভব হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ বোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া’র প্রধান পরিচালক মাওলানা নদভী নেত্রনিউজকে জানান যে, নতুন রেজিস্ট্রেশনটি ভিন্ন নামে অন্য কাউকে দিয়ে করানো হতে পারে। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আইনগতভাবে বোর্ডের কিছু করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অভিযুক্তকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে মামলা করার ক্ষমতাও কি বোর্ডের নেই? এবং তারা কি তা করেছেন?

এর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, গত তিন মাসে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ৫৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫২টিই মিথ্যা ও চক্রান্তমূলক। যদিও তিনি তাঁর এই দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি এবং কী ধরনের তদন্ত পরিচালনা করেছেন, গণমাধ্যমে তা জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। একের পর এক শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠান ও বোর্ডের প্রথম তাগিদ কেন নিজেদের ‘নিরপরাধ’ প্রমাণ করা হলো, কেন জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলো না—এই প্রশ্নগুলো কাঠামোগত ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল কয়েকজন বিকৃত মানুষের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল। ডেইলি স্টার–এ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি’র দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, শিশু নিপীড়নের সিংহভাগ ঘটে পরিবারে বা পরিচিত পরিবেশে, এবং মাদ্রাসার পাশাপাশি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গৃহশিক্ষকদের হাতেও শত শত শিশু নিপীড়িত হচ্ছে। সুতরাং, সমস্যাটিকে শুধু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক না দেখে এটিকে একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন, যেখানে আলেমসমাজসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের এই ক্রমবর্ধমান ঘটনাপ্রবাহ এবং এর বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনামই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং শিশুদের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতায়, আলেমসমাজ যদি তাদের চিরাচরিত নীরবতা ভেঙে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে এই সমস্যা আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে, যা সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত। এই পরিস্থিতিতে, তাদের কেবল চুপ করে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই, বরং এই সংকট নিরসনে তাদের একটি বলিষ্ঠ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...