সারাদেশময়মনসিংহ হাসপাতালে শয্যার চার গুণ রোগী, বারান্দা-মেঝেতে চিকিৎসা
ময়মনসিংহ হাসপাতালে শয্যার চার গুণ রোগী, বারান্দা-মেঝেতে চিকিৎসা
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যার চেয়ে চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন, যার কারণে রোগীদের বারান্দা, করিডর ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যার তুলনায় চার গুণের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের বেশি রোগী এই এক হাজার শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা না পেয়ে রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বারান্দা, করিডর এবং মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর, সোমবার, হাসপাতালের নতুন ভবনের লিফটের বাইরের অংশে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। হুড়োহুড়িতে কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এক হাজার শয্যার বিপরীতে কয়েক গুণ বেশি রোগী নিয়ে তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গতকাল ১৬ সেপ্টেম্বর, বুধবার, দুপুরে হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের তৃতীয় তলার করিডরে প্লাস্টিকের মাদুরে শুয়ে কয়েকজন রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা সেখানে অবস্থান করছিলেন।
টাঙ্গাইলের মধুপুরের ভ্যানচালক আবুল হোসেন (৬৫) চার দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর জন্য কোনো শয্যা মেলেনি; করিডরে একটি প্লাস্টিকের মাদুরেই তাঁর চিকিৎসা চলছে। আবুল হোসেনের স্ত্রী সমলা আক্তার বলেন, “কোথাও জায়গা নাই, এমন একটা অবস্থা। এর মধ্যে স্বামীর চিকিৎসা হচ্ছে। সিট পাওনের উপায় নাই।”
আটতলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত শিশু ওয়ার্ডে ৬০টি শয্যা রয়েছে। গতকাল দুপুরে এই ওয়ার্ডে ৩৫০ জন রোগী ভর্তি ছিল। ওয়ার্ডের বারান্দা, মেঝে ও লিফটের সামনের জায়গা রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে ঠাসা ছিল।
ত্রিশালের চকরামপুরের সেলিনা আক্তার গতকাল সকালে তাঁর এক বছর বয়সী মেয়ে আফরাকে জ্বর, ঠান্ডা-কাশি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করান। শিশুটি মেঝেতে পাতা প্লাস্টিকের মাদুরে ঘুমিয়ে ছিল। সেলিনা আক্তার বলেন, “এইখানে পা ফেলারও জায়গা নাই। কিন্তু আমরা এইখান থাইকা কই যাইবাম?”
চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত একজন নার্স জানান, রোগী বেশি থাকায় তাঁদের অনেক চাপ সামলাতে হয়। তিনি বলেন, “মানুষ দ্রুত সেবা পেতে চায়; কিন্তু আমরা যে অতিরিক্ত চাপ সামলাই, সেটা দেখে না।”
হাসপাতালে রোগীর সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা যায় মেডিসিন বিভাগে। পুরোনো ভবনে ১৭০ শয্যার এই বিভাগে গতকাল দুপুরে ৯৮৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, যা অনুমোদিত শয্যার প্রায় ছয় গুণ। সার্জারি বিভাগে ১৫০ শয্যার বিপরীতে গতকাল ৪৮৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। অন্যান্য বিভাগেও অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন।
ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা ছাড়াও টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও গাজীপুর জেলার রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ৬৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২৯৭ জন এবং ১৬ সেপ্টেম্বর সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৮১৯ জন রোগী ভর্তি হন।
হাসপাতাল প্রশাসন জানিয়েছে, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন চার গুণ রোগী ভর্তি থাকে। প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে অন্তত দুজন করে স্বজন থাকায় প্রায় ১২ হাজার লোকের চাপ সামলাতে হয়।
হাসপাতালের জনবলকাঠামো অনুযায়ী, ২ হাজার ২৮৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৫০টি পদ শূন্য রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা যায়, যেখানে ৪৬৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ২২১টি শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির ১৯৪টি পদের মধ্যে ৬৭টি শূন্য এবং ৪৬৬ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৪০টি পদ শূন্য আছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে চালু হওয়া সিটি স্ক্যান মেশিনটি গত মে মাসের শুরুর দিকে বিকল হয়ে যায়। এটি দিয়ে আগে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি পরীক্ষা করা হতো। বর্তমানে রোগীদের বাইরে গিয়ে সিটি স্ক্যান করাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, জনবলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। তিনি বলেন, “একজন চিকিৎসকের যে পরিমাণ রোগী দেখার কথা, বাস্তবে তাঁকে তার চেয়ে অনেক বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে রোগী ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই। রোগী আসছেন আর আমাদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা অতিরিক্ত চাপ নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি।”
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এম ইকবাল হোসেইন গতকাল হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে চার গুণ রোগীর চাপ এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটার সমাধান এক দিনে হবে না। তিনি জানান, ভবিষ্যতে কী হবে, সেটি নিয়ে তাঁরা কথা বলছেন এবং এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে কী পরিকল্পনা করা দরকার, তা ঠিক করতে প্রকৌশলীদের বলা হয়েছে।
মতামত (0)