সারাদেশ

উপকূলে বাড়ছে মৃত ডলফিন ও তিমির সংখ্যা

উপকূলে বাড়ছে মৃত ডলফিন ও তিমির সংখ্যা
উপকূলে বাড়ছে মৃত ডলফিন ও তিমির সংখ্যা
বাংলাদেশের উপকূল ও নদ-নদীতে মৃত ডলফিন ও তিমি ভেসে আসার ঘটনা বাড়ছে। এদের শরীরে আঘাত ও জালের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে, যা সামুদ্রিক প্রতিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ও নদীর তীরে বারবার মৃত ডলফিন ও তিমি ভেসে আসছে। এসব সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোনোটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, আবার কোনোটির মুখে বা শরীরে মাছ ধরার জাল জড়িয়ে ছিল। এই প্রাণীদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বরগুনার বিষখালী নদীতে একটি মৃত শুশুক ভেসে আসে। চার ফুট লম্বা এই শুশুকটির মুখে ছোট ফাঁসের একটি জাল প্যাঁচানো ছিল। এর আগে, গত ৯ সেপ্টেম্বর বরগুনার আন্ধারমানিক নদীর তীরে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি মৃত তিমি পাওয়া যায়।

ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, সর্বশেষ পাওয়া মৃত তিমিটি বেলিন প্রজাতির। এই তিমি পানি ছেঁকে ক্রিল ও প্ল্যাঙ্কটন খেয়ে থাকে। দক্ষিণ উপকূলে একের পর এক তিমির মৃতদেহ ভেসে আসা সামুদ্রিক প্রতিবেশের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি মৃত্যুর কারণ জানতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট বছরে শুধু কুয়াকাটা সৈকতেই ১৩৫টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬টি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে। একই সময়ে কুয়াকাটা সৈকতে প্রায় ৬০ ফুট লম্বা চারটি তিমির মৃতদেহও পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার উপকূলেও গত দুই বছরে ১৪টির বেশি মৃত ডলফিন এবং একটি মৃত তিমি ভেসে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডলফিন গবেষক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জানান, বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বরের মোহনা গাঙ্গেয় শুশুক ও ইরাবতী ডলফিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। তিনি বলেন, ছোট ফাঁসের অবৈধ জালের ব্যাপক ব্যবহার এসব আবাসকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

আবদুল আজিজ আরও উল্লেখ করেন, কয়েক বছর আগে গবেষকরা এই এলাকাটিকে ডলফিনের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি জানান, বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ ইরাবতী ডলফিনের আবাস বাংলাদেশে। সুন্দরবনে ৪৫১টি এবং উপকূলে ৫ হাজার ৩৮০টি ইরাবতী ডলফিন রয়েছে। একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু উদ্বেগজনক এবং বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে তিনি মনে করেন। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার স্বাদু পানিতে বসবাসকারী গাঙ্গেয় শুশুক নদীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। একসময় দেশের উপকূলীয় নদ-নদী এবং সুন্দরবনসংলগ্ন জলপথে শুশুক অহরহ দেখা যেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ নদীতেই শুশুকের দেখা মিলত, কিন্তু গত এক-দুই দশকে এর বিস্তৃতি কমে সুন্দরবন ও এর আশপাশের নদীগুলোয় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) গাঙ্গেয় শুশুককে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

২০২৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ও বন বিভাগের বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের মাত্র ১৪টি নদ-নদীতে গাঙ্গেয় শুশুকের উপস্থিতি রয়েছে। এই তথ্য দেশের নদীগুলোতে শুশুকের অস্তিত্বের সংকটের বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বন্য প্রাণিবিষয়ক সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) ২০০৬ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে ইরাবতী ডলফিনের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, ৫ হাজার ৮০০টি। বন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইরাবতী ডলফিনের প্রজাতি বিশ্ব থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বিপন্ন হয়ে পড়া ইরাবতী ডলফিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ। এখানকার উপকূলীয় এলাকার নদীগুলোতে নোনা ও মিঠাপানির অনুকূল ভারসাম্য এর একটি কারণ।

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জানান, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন–২০২৬ (সংশোধিত) অনুযায়ী, ডলফিন-তিমি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নতুন আইনে বন বিভাগ, কাস্টমস, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ডকে এই অপরাধ দমনে সংযুক্ত করা হয়েছে। এই আইন প্রয়োগে তাঁদের জনবলে ঘাটতি থাকলেও তাঁরা সাধ্যমতো কাজ করছেন। বন বিভাগ সুন্দরবনে পাঁচটি স্থানকে ডলফিনের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া অন্যান্য স্থান মিলিয়ে দেশে মোট নয়টি ডলফিনের অভয়াশ্রম রয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...