জাতীয়

পোশাকশিল্পের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চাওয়া

পোশাকশিল্পের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চাওয়া
পোশাকশিল্পের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চাওয়া
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল গতকাল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পোশাকশিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরে এবং সমাধানে তার সহযোগিতা কামনা করে। রাষ্ট্রপতি সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।

গতকাল বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদল দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরে। তারা এসব সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন।

রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পোশাক শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্পে যে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম চলে আসছে, তা সমাধানে সরকার কাজ করছে। বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে রাষ্ট্রপতি জানান।

সাক্ষাৎকালে বিজিএমইএ আগামী ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠেয় ২৫তম বাটেক্সপো ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। রাষ্ট্রপতি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিজিএমইএ সভাপতি দেশীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রসারে বর্তমান সরকারের নানামুখী দূরদর্শী ও শিল্পবান্ধব পদক্ষেপের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করেন।

বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বিলম্বিতকরণ, নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ পোশাক কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা প্রদান, নন-বন্ড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির পথ সুগম করা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলো শিল্প উদ্যোক্তাদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ অভিমত প্রকাশ করেন, এটি ইজ অব ডুয়িং বিজনেস নিশ্চিতকরণে বর্তমান সরকারের দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

বিজিএমইএ সভাপতি তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো রাষ্ট্রপতির সম্মুখে তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট, যেখানে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের অভাবে বেশিরভাগ কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদনে বাধ্য হচ্ছে। এটি রপ্তানি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয়ও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও মজুরি সমন্বয়ে গত তিন বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

রপ্তানি ও বিনিয়োগে মন্দাও দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ১.৬৪ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ১.৯২ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমায় নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। উচ্চব্যয় ও অর্ডার সংকটের মুখোমুখি হয়ে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা কর্মসংস্থানের জন্য চরম উদ্বেগজনক।

বিদ্যমান এ সংকট উত্তরণ ও তৈরি পোশাক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বৈঠকে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিগত সুপারিশ পেশ করা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দ্রুততম সময়ে অতিরিক্ত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন করা। গ্যাসের তীব্র সংকট নিরসনে দ্রুততম সময়ে নতুন টার্মিনাল যুক্ত করে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা ও আমদানি পর্যায়ে সকল শুল্ক-কর প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি (১৫০-৫০০ কেজি বয়লার বিশিষ্ট) কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ প্রদান এবং পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদে স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করা হয়।

এছাড়াও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বর্ধিত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে চালু করার কথাও বলা হয়। ব্যাংকিং, অর্থায়ন ও তারল্য সহায়তার জন্য চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার হ্রাস করার সুপারিশ করা হয়েছে। পোশাক খাতের জন্য বিশেষায়িত ‘পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম’ প্রণয়ন এবং জিআইএফ ও টিডিএফ তহবিলে অর্থ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির কথা বলা হয়।

কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া জটিলতামুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং পোশাক শিল্পের কাঁচামাল দ্রুত সরবরাহের স্বার্থে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করারও সুপারিশ করা হয়েছে। বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী এবং অন্য পরিচালকরা।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...