জাতীয়

অস্ট্রেলিয়ায় ডাক্তারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ, আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন বোন

অস্ট্রেলিয়ায় ডাক্তারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ, আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন বোন
অস্ট্রেলিয়ায় ডাক্তারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ, আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন বোন
অস্ট্রেলিয়ায় ডা. বিবেক প্যাটেলের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে ভুল ও অতিরিক্ত ওষুধ প্রেসক্রাইব করার অভিযোগ এনেছেন দুই প্র্যাকটিস ম্যানেজার। আদালতে তার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন বড় বোন ভিদিয়া প্যাটেল।

আদালতের কাঠগড়ায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন ডাক্তার প্যাটেল। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন উৎকণ্ঠিত রোগীও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এই মামলায় ডা. বিবেক প্যাটেলের পক্ষে তার বড় বোন ভিদিয়া প্যাটেল আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন। ভাইয়ের পক্ষে একজন আইনজীবীর এই উপস্থিতি আদালতের কার্যক্রমে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।

ডা. প্যাটেলের বিরুদ্ধে একটি অদ্ভুত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তিনি যে দুটি সার্জারিতে কাজ করেন, সেখানকার দুজন প্র্যাকটিস ম্যানেজার এই অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. প্যাটেল সময়ে সময়ে রোগীদের ভুল ও অতিরিক্ত ওষুধ লিখে দিয়েছেন। যেমন, যাদের হাঁপানি বা অ্যাজমা ছিল না, তাদের অ্যাজমার ওষুধ দিয়েছেন এবং যাদের গ্যাস্ট্রিকের কোনো সমস্যা ছিল না, তাদের গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সরবরাহ করেছেন।

আদালতকক্ষটি পরিচ্ছন্ন এবং একটি ভাবগম্ভীর নীরবতা সেখানে বিরাজমান। বিচারকের এজলাস মেঝে থেকে প্রায় দেড় ফুট উঁচু একটি মঞ্চে স্থাপন করা হয়েছে। এই মঞ্চে লাল ভেলভেটে পায়া পর্যন্ত আচ্ছাদিত একটি লম্বা টেবিল রয়েছে, যার মাঝখানে সিংহাসন আকৃতির একটি চেয়ার রাখা হয়েছে। টেবিলের দুই প্রান্তে আদালতের কর্মীদের জন্য দুটি চেয়ার রয়েছে।

আদালতকক্ষের একপাশে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা আরামদায়ক গদিআঁটা কিছু চেয়ার জুরিদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মঞ্চের পেছনের অংশটি একটি পাতলা প্লাইউডের পর্দার আড়ালে ঢাকা। বিচারক যখন আসন গ্রহণের জন্য পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন কক্ষে উপস্থিত সবাইকে উঠে দাঁড়াতে হয়। বিচারকের বাঁ দিকে আসামীর কাঠগড়া এবং সামনের মেঝেতে এক পাশে আইনজীবীদের জন্য ডেস্কসহ চেয়ার ও যাতায়াতের পথ রাখা হয়েছে।

অন্যপাশে দর্শকদের জন্য চেয়ার পাতা রয়েছে এবং একদম পেছনে বিবদমান দুই পক্ষের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিচারক আসন গ্রহণ করে আদালতের কাজ শুরু করেন এবং প্রথমেই জুরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচারকের সহকারীরা নাম বলার পর সেই নামের ব্যক্তি বিবদমান দুই পক্ষের সামনে দিয়ে হেঁটে ঘোরাপথে দর্শকসারিতে নিজের আসনে এসে বসেন।

হাঁটার সময়ে দুই পক্ষই তীক্ষ্ণভাবে লোকটিকে পর্যবেক্ষণ করে। এরপর হঠাৎ করে খরখরে গলায় কোনো এক পক্ষ ‘চ্যালেঞ্জ’ ধ্বনি উচ্চারণ করে, যা আদালতের গুরুগম্ভীর পরিবেশে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ‘চ্যালেঞ্জ’ শুনেই চলন্ত ব্যক্তি থমকে দাঁড়ায় এবং ভয়ও পায়, এরপর নিজ আসনে ফিরে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। ‘চ্যালেঞ্জ’ মানে হলো জুরি হিসেবে তাকে কোনো এক পক্ষ চাইছে না।

ভিদিয়া লক্ষ্য করেন যে, কুর্তা-পায়জামা পরিহিত ও ওড়নায় মাথা ঢাকা মাঝারি গড়নের উজ্জ্বল ত্বকের একজন পরিণত বয়সের মহিলা ‘চ্যালেঞ্জ’–এর মুখে পড়ে বাদ পড়েন। বাদামি চামড়া, খয়েরি চোখ ও কালো গোফওয়ালা একজন পুরুষও জুরি নির্বাচন থেকে বাদ পড়েন। অবশেষে বারোজন জুরি নির্বাচিত হওয়ার পর বিচারকের বাঁ দিকে রেলিংঘেরা জায়গায় জুরিরা আসন গ্রহণ করেন এবং মূল বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

প্রথমে বাদীপক্ষের আইনজীবী তার অভিযোগ পেশ করেন। অভিযোগ শুনতে শুনতে ভিদিয়া আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তার ভাইয়ের দিকে তাকান। তার চোখে অশেষ স্নেহ ঝরে পড়ে। ডা. প্যাটেলকে ভাসা-ভাসা চোখে ভীতবিহ্বল বিষণ্নতা নিয়ে মাঝারি উচ্চতার নম্রভদ্র এবং দেখতে ভালো হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

বোনের মনে সূক্ষ্ম এক অপরাধবোধ জাগে। তিনি ভাবেন, ডা. প্যাটেল আজ যে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, তার পেছনে বোন হিসেবে তারও কি কোনো ভূমিকা ছিল না? তিনি মনে মনে স্বীকার করেন যে, হ্যাঁ, তার ভূমিকা ছিল। ভিদিয়া নিজে ডাক্তারি পড়তে চাননি, কিন্তু মা-বাবার ইচ্ছার কাছে তিনি হার মানেননি। মা-বাবা সমাজে সবার ওপরে থাকার জন্য দুই সন্তানকেই ডাক্তার বানানোর জন্য নানা চেষ্টা করেছিলেন।

ভিদিয়া ও তার ভাই দুজনেই মেধাবী ছিলেন, তাই ডাক্তারি পড়ায় অসুবিধা থাকার কথা ছিল না। তবে ভিদিয়ার মতে, মেধাবী হলেই যে ডাক্তার হওয়া চাই, তা কেন? একজন ডাক্তার হতে হলে কেবল মেধাবী মাথা যথেষ্ট নয়। সেবা করার জন্য দয়ালু অন্তর এবং পুঁজ, রক্ত, বমি দেখেও সহ্য করার মানসিক শক্তি থাকা চাই। রোগী যখন ঘাম, জ্বর ও অসুখের গন্ধ নিয়ে আসবে, তখন ডাক্তারকে সব মেনে নিয়েই প্রেসার ও জ্বর মাপার জন্য রোগীকে স্পর্শ করতে হবে। এই স্পর্শ কেবল কর্তব্যই নয়, এতে ডাক্তারের আন্তরিক সেবার আশ্বাসও থাকা চাই।

ভিদিয়া পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন, “আমি জ্বর, বমি, ঘা, পাতলা পায়খানা কোনোকিছু দেখতে বা ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাই না, তাই ডাক্তার হওয়ার শখ আমার নাই, ইচ্ছাও নাই।” মা-বাবা তখন তাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে তাকে ওইসব ঘাঁটতে না হয়। কিন্তু ভিদিয়া দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “আমি পাগলের ডাক্তার প্যাটেল হতে চাই না।” এরপর হেসে দিয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, “বাংলাদেশি বন্ধুরা আমাকে বলবে পাগলের ডাক্তার পটল।”

সেই ভিদিয়া তার ছোট ভাইকে মা-বাবার শখ পূরণের জন্য নাকি তাদের ইচ্ছার কাছে বলি হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত ও প্ররোচিত করেছিলেন। ভাই তার নরম মনের হৃদয়বান মানুষ। ভাই ডাক্তার হতে চায়নি। ভিদিয়া তাকে অনেক করে বুঝিয়েছিলেন, “দেখ ভাইয়া তুমিও যদি মা-বাবার শখ পূরণ না কর তারা মারাই যাবে!” তার ভাই হয়তো তাকেই মে (বাক্য অসম্পূর্ণ)।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...