জাতীয়

উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একনেকের ভূমিকা

উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একনেকের ভূমিকা
উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একনেকের ভূমিকা
সরকারের বড় উন্নয়ন প্রকল্পের নীতিগত ও আর্থিক অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এটি প্রকল্প অনুমোদন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করে।

সরকারের নীতিগত ও আর্থিক অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সড়ক, সেতু, নতুন রেললাইন, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা পানি সরবরাহ ব্যবস্থার মতো বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। প্রতি সপ্তাহে একনেক সভা ঘিরে সরকারি মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদরা একনেকের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখেন। কোন প্রকল্প অনুমোদন পেল, কত টাকা ব্যয় হবে, বাস্তবায়নের সময় কত, বা কোনো প্রকল্পের ব্যয় বাড়ল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা আগ্রহী থাকেন। দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের পথে যাওয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

'জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি' হলো একনেকের পূর্ণাঙ্গ নাম। এটি সরকারের একটি নির্বাহী কমিটি যা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব বিবেচনা ও অনুমোদন করে। একনেকের কাজ শুধু প্রকল্প অনুমোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনাও এর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা ও তার অগ্রগতি পর্যালোচনাও একনেকের অন্যতম কাজ। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক দিকটি দেখার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

একনেক সভাকে একটি প্রকল্পের চূড়ান্ত পরীক্ষার টেবিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থা বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে সেটির প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়, বাস্তবায়নকাল এবং সম্ভাব্য সুফলসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যালোচনার পর তা একনেকের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

সভায় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে একনেক প্রকল্পটি অনুমোদন, সংশোধন কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী একনেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী বিকল্প চেয়ারম্যান হিসেবে সভায় সভাপতিত্ব করেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা একনেকের সদস্য হিসেবে থাকেন। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু, কৃষি, তথ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিকল্পনা, শিল্প, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, বাণিজ্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা অন্তর্ভুক্ত।

কোনো প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হলে সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীও সভায় অংশ নেন। একনেকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিব এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব সভায় সহায়তা করেন।

অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিবও প্রয়োজন অনুযায়ী একনেকের সামনে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠার সময় থেকেই উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

১৯৭২ সালে মন্ত্রিসভাকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাঠামো গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করার লক্ষ্যে একনেকের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একনেকের গঠন ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তখন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। শিল্প ও বাণিজ্য, পূর্ত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাও এতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একনেকের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অর্থমন্ত্রী একনেকের সভাপতি হন।

পরের মাস অক্টোবর থেকে সরকারপ্রধান একনেকের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিটির গঠন ও কার্যপরিধিতে পরিবর্তন আনা হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...