জাতীয়

এজলাসে বাগবিতণ্ডার পর প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ

এজলাসে বাগবিতণ্ডার পর প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ
এজলাসে বাগবিতণ্ডার পর প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ
তথ্য গোপনের অভিযোগে এক আইনজীবীকে জরিমানার বিষয় নিয়ে প্রধান বিচারপতি ও বার সভাপতির বাগবিতণ্ডার পর আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন।

তথ্য গোপনের অভিযোগে এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়কে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এক বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে এই তর্কাতর্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন।

গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। শুনানির একপর্যায়ে বার সভাপতি ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতি ও বার সভাপতির মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়।

পরে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি জানান, একজন আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে বিনয়ের সঙ্গে জরিমানার অর্থ মওকুফের আবেদন করেন। তিনি প্রধান বিচারপতিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, বর্তমানে আপিল বিভাগে মামলার শুনানি কম হওয়ায় আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা অনেক বেশি হয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বার সভাপতি বলেন, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতির একটি বেঞ্চসহ মোট তিনটি বেঞ্চ ছিল এবং তিন বেঞ্চেই মামলা শুনানি হতো। বর্তমানে একটি বেঞ্চ থাকায় কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ বা ইনজাংশন হলে পরবর্তী সময়ে শুনানির সুযোগ পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। নিজের একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই মামলায় আসামি দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের সাজা হতে পারে। কিন্তু আপিল বিভাগে মামলাটি এক বছর ধরে স্থগিত রয়েছে।

এ বিষয়ে তিনি চারবার চেম্বার জজের কাছে শুনানির আবেদন করেও সুযোগ পাননি বলে দাবি করেন। শুধু তার নিজের মামলা নয়, অন্য আইনজীবীরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে তিনি জানান। মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আপিল বিভাগে মামলার মেনশন করা যাচ্ছে না। কোনো মামলা কেন ওপরে ছিল, পরে কেন নিচে নেমে গেল—এসব বিষয়েও মেনশন করা সম্ভব হচ্ছে না। একটি বেঞ্চ থাকায় অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মামলার শুনানি করতে পারছেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের পক্ষে আবেদন করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আইনজীবীদের মামলা কমে যাওয়ায় আয় কমেছে—এ কথা তিনি বাস্তব পরিস্থিতি থেকেই বলেছেন বলেও জানান বার সভাপতি।

অন্যদিকে, আপিল বিভাগে ঠিক কী ঘটেছিল এবং প্রধান বিচারপতি কেন এজলাস ছেড়ে যান—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন আপিল বিভাগে এসে একজন আইনজীবীকে জরিমানা করার বিষয়টি তুলে ধরেন। জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, সবকিছু পর্যালোচনা করেই আদালত আদেশ দিয়েছেন এবং সেই আদেশ পরিবর্তন করা হবে না। অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ওই ঘটনায় আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আগের আদেশও অমান্য করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি বার সভাপতিকে বিষয়টি নিয়ে এ ধরনের কথা না বলার জন্য বলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। বিষয়টি প্রধান বিচারপতি প্রথমে হালকাভাবে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কি সত্যিই এমনটি বোঝাতে চেয়েছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এরপরও বার সভাপতি একই বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এ ধরনের বক্তব্য আদালত অবমাননার শামিল। তিনি আরও বলেন, এমন বক্তব্যের পর তিনি সেদিন আর আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এরপর প্রধান বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত একই ঘটনায় একাধিক রিট মামলা করায় তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন আপিল বিভাগ। এই জরিমানার অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নুর আলমের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। অপর নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অনীক আর হক, সিনিয়র আইনজীবী মো. শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...