সারাদেশ

সুন্দরবনে ফিরছে প্রাণ, মিলছে বাঘ-হরিণ-কুমিরের দেখা

সুন্দরবনে ফিরছে প্রাণ, মিলছে বাঘ-হরিণ-কুমিরের দেখা
সুন্দরবনে ফিরছে প্রাণ, মিলছে বাঘ-হরিণ-কুমিরের দেখা
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে সজীবতা ফিরে এসেছে। বাঘ, হরিণ ও কুমিরের মতো বন্যপ্রাণিদের অবাধ বিচরণ দেখা যাচ্ছে।

সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে সজীবতা ফিরতে শুরু করেছে। তিন মাস ধরে মানুষের চলাচল সীমিত থাকায় বনের পরিবেশ তার নিজস্ব স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়েছে। এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে বাঘ, হরিণ ও কুমিরের দেখা মিলছে নিয়মিত।

গত ২৪ জুলাই দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ির সামনে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রাজার মতো হাঁটতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে বাঘটি বনের গভীরে চলে যায়। বনকর্মীরা এই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন।

এর দুই দিন পর গত ২৬ জুলাই সকালে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য এলাকায় আরেকটি বাঘকে নদী সাঁতরে বনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বনকর্মীরা বাঘটিকে দেখে উল্লাস প্রকাশ করেন এবং এর ছবিও ধারণ করেন।

গত আগস্ট মাসের প্রথম দিকে ঢাংমারি নদী পার থেকে একটি বিশালাকৃতির কুমির একটি ছাগলকে ধরে খেয়ে ফেলে। স্থানীয় একজন ব্যক্তি মুঠোফোনে কুমিরের ছাগল শিকারের এই দৃশ্য ধারণ করেন। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়।

বাঘ ও কুমিরের পাশাপাশি বনের কটকা, জামতলাসহ বিভিন্ন স্থানে হরিণের ঝাঁক দেখা যাচ্ছে। বন্য শুকর ও বানরসহ অন্যান্য প্রাণিকেও অবাধে বিচরণ করতে দেখা গেছে। বন সংশ্লিষ্টরা বন্যপ্রাণিদের এমন বিচরণকে তিন মাস ধরে জেলে, বাওয়ালী, বনজীবী ও দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধের সুফল হিসেবে দেখছেন।

বন বিভাগ জানিয়েছে, টানা তিন মাস অবরোধের ফলে বনে বন্যপ্রাণিদের চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকার বাইরেও বিভিন্ন প্রাণির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বনে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, ছইলাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও বেড়েছে।

বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বন্ধের সময় সুন্দরবনে বন্যপ্রাণিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি টের পাওয়া গেছে। সম্প্রতি নিয়মিত টহলের সময় তিনি বাঘের শরীরের গন্ধ অনুভব করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে বাঘটি কিছুক্ষণ আগেই সেখান দিয়ে গেছে।

বনরক্ষী শামীম বলেন, বন্ধের সময় জোয়ার ও ভাটার হিসাব করে তারা ২৪ ঘণ্টাই টহল দিয়েছেন। এই সময়ে শুকর, হরিণ ও সাপের দেখা মিলেছে। বনের মধ্যে খালগুলোতে মাছও বেড়েছে। ট্রলার চলার ঢেউয়ে চিংড়ি, দাতিনাসহ বিভিন্ন মাছকে লাফালাফি করতে দেখা গেছে, যা স্বাভাবিক সময়ে অত বেশি দেখা যায় না।

অবরোধের সময়ে সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালী, বনজীবী ও পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও অপরাধীরা বনে প্রবেশের সুযোগ খোঁজে। এ কারণে এই সময়ে বন অপরাধের শঙ্কা বেশি থাকে। শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ শরিফুল ইসলাম জানান, বন অপরাধীদের রুখে দিতে এই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, অবরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্মার্ট টহল কার্যক্রম মাসে ৭ দিনের পরিবর্তে ২০ দিন করা হয়েছিল। এছাড়া জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে ২৪ ঘণ্টা টহল দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিগত বছরগুলোর তুলনায় বন অপরাধও কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মোঃ শরিফুল ইসলাম আরও জানান, সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণি ও মাছসহ জলজ প্রাণির প্রজনন সুরক্ষায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা ৩১ আগস্ট রাতে শেষ হয়েছে। গতকাল ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকে দর্শনার্থী ও বনজীবীরা বনে প্রবেশ করছেন। তিনি মনে করেন, সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে এমন অবরোধের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় উপকূলের জেলেরা সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য নৌকা ও জাল মেরামতসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। তিন মাস কেউ মাছ ধরেনি, তাই এবার পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন জেলেরা। শরণখোলা উপজেলার জেলে মাসুম খান বলেন, নৌকা ও জাল প্রস্তুত করা হয়েছে এবং দু’একদিনের মধ্যেই সুন্দরবনে যাবেন।

অন্যদিকে গতকাল ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকে সুন্দরবন পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তিন মাস বন্ধ থাকার পর দেশী-বিদেশী পর্যটক ও সব ধরনের বনজীবীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। এই বছর নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন শুধু করমজল ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র ছাড়া বাকি সবগুলো পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছিল।

নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর দর্শনার্থীরা লঞ্চ, ট্যুরবোট, ট্রলার ও বিভিন্ন নৌযানে চড়ে সুন্দরবনের কটকা, কচিখালী, হারবাড়িয়া, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর ও নীলকমলসহ সমুদ্র তীরবর্তী এবং বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে যেতে পারবেন। ট্যুর ব্যবসায়ী ও বন বিভাগ আশা করছে, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর অসংখ্য পর্যটক প্রতিদিন সুন্দরবনে ভিড় করবেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...