সারাদেশচুয়েটে পুকুরে ডুবে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু, নকশা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
চুয়েটে পুকুরে ডুবে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু, নকশা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পুকুরে ১৬ দিনের ব্যবধানে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা পুকুরটির নকশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পুকুরে গত ১৬ দিনের ব্যবধানে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা পুকুরটির নকশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পুকুরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের পাশে অবস্থিত।
গত ২৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্ণব সাহা ওই পুকুরে ডুবে মারা যান। এর দুই সপ্তাহ পর, গত ১২ আগস্ট, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শান্ত দেব এবং কম্পিউটারবিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের চমক দত্তের একই পুকুরে মৃত্যু হয়। শান্ত ও চমক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, প্রথম দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পানিতে ডুবে মৃত্যু ঠেকাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের মতে, এর ফলেই দুই সপ্তাহ পর আবারও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। দ্বিতীয় দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুকুরটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেখানে প্রবেশ ও সাঁতারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
এরপর তিন দিনের মধ্যে পুকুরের পানি সেচে তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে পুকুরটি অনেকটাই পানিশূন্য। কোথাও পুকুরের তলার কাদামাটি দেখা যাচ্ছে, কোথাও জমে আছে অল্প পানি। অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও এই পুকুর ছিল পানিতে টইটম্বুর।
পুকুরটির নকশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর ঢালের অনুপাত ১:২। অর্থাৎ উল্লম্বভাবে ১ ফুট নিচে নামার বিপরীতে অনুভূমিক দূরত্ব ২ ফুট। পাড় থেকে নেমে প্রথম সমতল অংশে পৌঁছাতে প্রায় ৮ ফুট নিচে নামতে হয়। এরপর থেকেই মূলত পুকুরের পানি শুরু হয়। সেখান থেকে একই অনুপাতে ঢাল নেমে গেছে আরও প্রায় ৮ ফুট।
পুরকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, পাড়ের কাছাকাছি অংশেই পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ। পুকুরে নামা কেউ ভারসাম্য হারালে অল্প দূরত্বেই গভীর পানিতে চলে যেতে পারেন। জনসাধারণের ব্যবহারের পুকুরে তুলনামূলক মৃদু ঢাল রাখা নিরাপদ। ১:৩ বা ১:৪ ঢাল হলে গভীরতা ধীরে বাড়ে।
এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে এবং উদ্ধারকাজও তুলনামূলক সহজ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেছেন, পুকুরের পার্শ্বের ঢাল ১:২-এর পরিবর্তে ১:৩ হলে পাড়ের কাছাকাছি নিরাপত্তা আরও ভালো পাওয়া যেত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুকুরের আদর্শ প্রস্থচ্ছেদ বজায় রাখাও জরুরি, যা ঢালের স্থায়িত্ব ও পুকুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
তার মতে, কাজের সময় সঠিক তদারকি এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী তারেকুল আলম জানান, কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল-সংলগ্ন পুকুরটি বেশ পুরোনো। শিক্ষার্থীদের অনুরোধে ২০২৪ সালে পুকুরটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘সারা দেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুকুরটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। পুকুরটি সংস্কারে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়।
চলতি বছরের এপ্রিলে পুকুরের সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়। তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর তদন্ত শুরু হওয়ায় বর্তমানে সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী তারেকুল আলম বলেছেন, "পুকুর তো এভাবে বন্ধ করা যায় না। তবু আমরা করেছি। প্রথম দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে এত দ্রুত আবার দুর্ঘটনা ঘটবে, তা কেউই ভাবেনি।"
পুকুরটির প্রকৃত গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রনি দের দাবি, পুকুরটির গভীরতা ৮ থেকে সাড়ে ৮ ফুট। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুকুরের বিভিন্ন অংশে গভীরতা ১০ থেকে ১২ ফুট।
অর্থাৎ নকশায় উল্লেখ করা গভীরতার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। পাড় থেকে অল্প দূরত্বেই গভীর পানিতে পৌঁছানোর সুযোগ থাকলেও পুকুরের আশপাশে গভীর বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে কোনো দৃশ্যমান নির্দেশনা ছিল না।
পুকুরটির নকশা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের প্রধান অধ্যাপক দেলোয়ার হোসাইন বলেন, "পুরো প্রকল্প একটি স্থানীয় সরকারি প্রকৌশল বিভাগ দেখভাল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে পরিদর্শন করেছে।"
অনুমোদনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সহযোগী অধ্যাপক তারেকুল আলম জানান, প্রকল্প শুরুর সময় তিনি প্রকৌশল দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন না। তার মতে, তখন যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তিনি হয়তো সবকিছু বুঝেই এই কাজের অনুমোদন দিয়েছিলেন।
মতামত (0)